যার বিয়া তার কোন খবর নাই, পাড়াপড়শির ঘুম নাই।
শালারা ছাগলের দল।

ধন্যবাদ

থ্যাঙ্কু ভাইয়া

বস কিছু বানান ভুল আছে ঠিক করে দিন।
কবিতায় আবেগ  প্রকাশরীতি ভাল লাগল

অচেনাকেউ wrote:

চমৎকার এই লেখার জন্য একটা + সম্মাননা  :cloud9:

থ্যাঙ্কু

লেডি উইথ দি ল্যাম্প  জন্মগ্রহণ করুক কলুষিত বাংলার মাটিতে।

কালো জিরা সেবন শুরু করলাম।

ভালো পদ্ধতি।

বাহ

৬০

(৪ replies, posted in তথ্য বটিকা)

পা টা সবসময় খালি রাখতে মন চায়।

আরো জানতে চাই।

:applause:

sawontheboss4 wrote:

:cloud9:   :cloud9:  কবিতার থিম টা যেভাবে দাড় করান হয়েছে, চমত্কার।  :applause:

মন্তব্যের জন্য ধন্যবাদ

কে তুমি ?
ওহে আঁধার পথের সারথী ?
চেয়ে দেখ ; অযূত প্রাণের মিলন-মেলা
                তরুন প্রাণের বিজয় খেলা
ডঙ্কা বাজিছে ময়দানে আজ
                 সাঙ্গ করিব তিমির বেলা ।
ওকি ! তুমি লুকাও কেন ?
        আলোর পরে আসিছে আলো
        সবাই তারে বাসিছে ভালো
মনের কথা বলিব আজ
       তাড়িয়ে যত আঁধার কালো।

ওহে !  তুমি কি সেই ঘৃণিত হিটলার, তাতে কি ?
                  লাখো মানুষের রক্ত ঝরে
               ছিলে;  ক্ষমতাটা আঁকড়ে ধরে
কত পাপ আর অভিশাপ কুড়িয়েছ
                   সে তো সেই স্বজাতির তরে! 
এসো হে ! আজ এই পূণ্যতটে।

ওহে ! মুখটি ঢেকে সঙ্গোপনে, লুকাও কেন দূর দেশে ?
        একি!  তুমি কি সেই চেঙ্গিস কিংবা হালাকু খাঁন
   যুদ্ধ বাধিয়ে ঝরিয়েছ তব লাখো লাখো তাজা প্রাণ ?
           তবুও তো  পেয়েছ আপন জাতির সন্মান
    এসো হে এই পূণ্যতটে, রাখো মোর আওভান।

ওহে ! যাও কেন দূরে সরে
তাকাও ফিরে  মুখটি ঘুরে।
      একি ! তুমি কি সেই বেঈমানরাজ মীরজাফর
     বঙ্গমাতার বুকে বসিয়েছিলে যে বিষের কামড় ?
     
ওহে তুমি তো শত্রু ছিলে নবাবজাদার
     স্বেচ্ছায় করনি’ক ক্ষতি আপামর জনতার
     তবে কেন পলায়ন কর
    এসো এই জনতার ভিড়ে, কর মোর হস্ত শৃঙ্গার ।

কে তুমি, আছ রাক্ষস বেশে ?
এসো এসো এই নূতন দেশে।
হায় পাপের বোঝাতে তুমি যে চলৎহীন
চলিতেছে আজ যে তোমার ঘোর দূর্দিন ।
ডাকিছি তোমায় এই বক্ষ মাঝে
এসো হে সব শোক তাপ ভুলে।

ওরে চেঙ্গিস,হালাকু, আবু জেহেল, মীরজাফর
কে কোথা আছিস, কর নব অতিথিকে কূর্ণিশ কর।
আজিকার দিনে-
ঈমান-বেঈমান, পাপ পূণ্যের ধার ধারি না’ক
পাপী-তাপী সব মিলে একসাথে রব, ডাক সবাইকে ডাক ।

হঠাৎই মীরজাফর মিনমিনিয়ে বললে-
          গুরু! এতো দানব নহে, নহে রাক্ষস –খোক্ষস
        এতো বাংলার রাজাকার, আলবদর আর আলশামস।
       
     পলাশীর প্রান্তরে শুধু আপন সৈন্য অচল রেখে করেছি যে পাপ
        মানুষের মুখে মুখে আজও ঝরিছে যার ঘৃণা আর ভীষণ উত্তাপ
       
হায়! একদিনের ভুলে পেয়েছি আমি যত অভিশাপ-ধিক্কার
শত শত দিনের ভুলেও পায়নি’ক ততো, এই বাংলার রাজাকার।
         
লাখো বোনের ইজ্জত করিল যারা হরণ
      তাদেরই আগমনে বাঙ্গালীরা রচিলে নয়নভিরাম তোরণ
    কেমন করিয়া বলি-লাখো শহীদের রক্ত চাটিল যে জানোয়ার
                             তাদেরই চরণে নিজেরি সঁপিলে বারবার।
                 
লজ্জায় যায় মোর মাথা কাটা
দেশবিরোধী ছিল যারা, তাদেরই হাতে দিলে বাংলা শাসন করিবার ক্ষমতাটা।
       ওহে আওভানকারী ব্লগার, শুনে রাখ পাতিয়া দুই কান
        রাজাকারের সাহচর্যে খোয়াইতে পারিব না অবশিষ্ট মোর মান।

আমি কাঁদিয়া উঠিয়া বলি-
ওহে মীরজাফর! যেও নাক পাপীদের এই দল ছাড়ি
চিনিতে পারিনি গো এ যে মস্ত শয়তানের ধাড়ি।

চেয়ে দেখ- আমিই যে ধর্ষকামিতার শিকার হওয়াদের অনূজ
প্রাণের দায়ে চারিটি দশক গুটায়ে রেখেছি তব ভূজ।

আমি আজ উদ্দাম তরুণ, আমি দুর্দমনীয় শক্তি করেছি সঞ্চিত
খুনির রক্তে করিব যে দুই হাত রঞ্জিত।
আমি শুনেছি ইজ্জত হারানো মায়ের করুন কাহিনী
ওরে হিটলার চেঙ্গিস আবার সাজা তোদের নৃশংস বাহিনী।

আমি আসিতেছি, নিস্তার নাই
রাজাকার মুন্ডুতে বাজিবে যে ঘরে ঘরে সানাই
আপন মাতা ভগিনীর যোনীপথ ছেদিল যে পশু
বিনাশ তাদের না করি থামিবে না মোর হস্ত কভু।

আমি বিক্রমে কাটিয়া শামস-রাজাকার-বদরের মুন্ডুটা
উড্ডীন করিব ফের বাংলার লাল সবুজ পতাকাটা।
                                       
                                                                  এফ এইচ রিগ্যান 
                                                                   ২২.০৫.১০

জট্টিল

:jump:  :jump:  :jump:

(গুরুর কাছে ক্ষমাপ্রার্থনাপূর্বক নিবেদন)
বরের বাপ সবুর করিতে পারিতেন,কিন্তু কন্যার বাপ সবুর করিতে পারিলেন না, কেননা ইতিমধ্যে তাঁহার পঞ্চম বিবাহের বয়স পার হইয়া যাইতেছে। তাছাড়াও কন্যার বয়সও অবৈধ রকমভাবে বাড়িয়াছে, ফলে দূর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটিবার আশংকাও একেবারে উড়িয়া দেওয়া যায় না।

আমি ছিলাম বর! সুতরাং আমার মত যাচাই করিবার আবশ্যকতা ছিল না। আমার কাজ আমি করিয়াছি, গ্রামীন ব্যাংক হইতে লোন তুলিয়া একখানা ভ্যান কিনিয়াছি। পাত্র উপার্জনক্ষম এবং পন বেশি পাওয়া যাইবে, তাই প্রজাপতির দুই পক্ষ , কন্যা পক্ষ ও বরপক্ষ ঘন ঘন বিচলিত হইয়া উঠিল।
সত্য বলিতেছি, আমার মনে বিশেষ কোন উদ্বেগ জন্মে নাই। বরং রোমাঞ্চ অনুভব করিয়াছি, কৌতুহলী কল্পনার কিশয়গুলির মধ্যে যেন একটু হাতাহাতি ভাব খেলিয়া গেল। যাহাকে প্রতিদিন নুন্যতম পঞ্চাশ মাইল ভ্যান চালানোর স্বাদ উপভোগ করিতে হইবে তাহার পক্ষে এ ভাবাটা দোষের। আমার এ লেখা যদি ব্লগে প্রকাশিত হইবার ভয় থাকিত তবে একটু সাবধান হইতাম।

কিন্তু এ আমি কি করিতেছি! একটা গান লিখিতে বসিয়া উপন্যাস লিখিতেছি। এমন সুরে লেখা আরম্ভ হইবে তাহা কি আগে জানিতাম? মনের মধ্যে যে চাপা ক্ষোভ জন্মিয়াছে তাহাকে বৈশাখ সন্ধ্যার ঝোড়ো বৃষ্টির মত প্রবল বর্ষণে নিঃশেষ করিয়া দিব, না পারিলাম গীতিকার হইতে, না পারিলাম হারপিক ওয়ান প্রতিযোগীতার গায়ক হইতে যাহাতে মনের দুঃখগুলো গান আকারে ভিতর হইতে বাহির করিয়া আনিয়া জনসন্মুখে প্রকাশ করিব। সেই জন্য আমার মধ্যকার অশ্রুহীন,হতভাগা,শ্মশানচারী সন্যাসিটা অট্টহাস্যে আপনাকে আপনি প্রহার করিতেছে।

আমার সঙ্গে যাহার বিবাহ হইয়াছিল তাহার সত্য নামটা দিব না কারন, কোন মানুষই তাঁহার নিজ সন্তানের জন্য ঐ নামটা রাখিবার জন্য পরষ্পরের সহিত রক্তপাতে লিপ্ত হইবে না। তাছাড়া তাহার নামটি লইয়া কোন প্রকার সিনেমা, থিয়েটার প্রস্তুত হইবার সম্ভাবনাও নাই। তাহার নাম বিশেষ রঙের হরফে আমার মনের মধ্যে খোদাই করা আছে।
আমার এ লেখায় তাহার একটি নাম থাকা চাই। আচ্ছা তাহার নাম দিলাম ওলা বিবি, কেননা যে স্বপ্ন হইয়া কাছে আসে আবার শরীরের সমস্ত শক্তি হরণ করিয়া মরিচীকার মত অদৃশ্য হইয়া যায় সেই ওলা বিবির কথাটা বারবার মনে করাইয়া দেয়।

ওলা বিবি আমার চেয়ে কেবল ছয় বছরের বড় ছিল। অথচ আমার পিতা যে প্রৌঢ়া দানের পক্ষপাতি ছিলেন, তাহা নহে। তাহার পিতা ও আমার পিতা্র মধ্যে স্বভাবে যথেষ্ঠ মিল ছিল। তবে আমার পিতা উগ্রভাবে সমাজ বিদ্রোহী, মানিতে তাঁহার বাধে এমন জিনিস অন্দরে, দেউড়ি বা খিড়কিতে খুঁজিয়া পাওয়া দায়। কোন মতামতই সরল স্বাভাবিক নহে, তবুও বড় বয়সের মেয়ের সাথে ছেলের বিবাহ দিলেন কারন , মেয়ের বয়স বড় বলিয়া যৌতুকের অংকটাও বড়। ওলা বিবি আমার শ্বশুরের দ্বাদশতম ও কনিষ্টতম স্নেহশীলা কন্যা। বাবার বিশ্বাস ছিল এই স্নেহশীলার কল্যানেই তাহার বাবা ভাবী জামাতার অনন্ত চাহিদাকে পূরণ করিতে সচেষ্ট হইবেন।

সবেমাত্র বাইশ-এ পা দিয়াছি , এমন সময় আমার বিবাহ হইল। বয়সটা সমাজ সংস্কারকের মতে উপযুক্ত কিনা তাহা লইয়া দুইপক্ষ গোলাগুলি করিয়া গুলিবিদ্ধ হইয়া মরুক, কিন্তু আমি বলিতেছি ,সে বয়সটা তারুণ্য দিয়া অর্থ উপার্জনের পক্ষে যত ভালই হউক, বিবাহের সন্মন্ধ আসিবার পক্ষে কম ভাল নয়।
বিবাহ নামক তামাশার সূচনা হইল আমার এক সহকর্মীর একখানি ফটো লইয়া মস্করার মাধ্যমে। সে একদিন আমার হাতে ওলা বিবির ছবিখানি গুঁজিয়া দিয়া কহিল, “এইবার সত্যিকারের রোজগার কর, একেবারে রক্ত-মাংস পানি করিয়া কর।”

কোন এক চাটুকার গোছের কারিগরের তোলা ছবি। সুতরাং তাহার মাথার কিছু অংশ কাটিয়া গিয়াছে ফলে চুল আছে কিনা সে সন্মন্ধে ভাবনার উদয় হইল। পায়ে হাইহিল জুতা,শাড়ী,মুখে বিছাপোকার মত লালটুকটুক লিপিস্টিক, দুইনলা বন্দুকের মত নাক, সুবিশাল বক্ষ ইত্যাদি লইয়া যে কি অবস্থা সে আমি বলিতে পারিব না। আমি আশ্চর্য হইলাম ইহাতে বাংলা ছবির নায়িকার মত শুধু স্যান্ডো গেঞ্জি ও হাফ প্যান্ট পরিয়া বরপক্ষের চোখ ভুলাইবার জন্য জালিয়াতির চেষ্টা করা হয় নাই। পটের ছবিটির উপর আমার মনের লৌহ কাঠি লাগিতেই তাহার বিশেষ ভাবের মুখখানা আমার জীবনের মধ্যে জাগিয়া উঠিল।

যাহা হউক চার-পাঁচটা বিবাহের লগ্ন পিছাইবার পর শুভ মূহুর্ত উপস্থিত হইল। সে দিনের প্রতিটি মুহুর্ত আমার জীবনে এখনও বিষফোঁড়া হইয়া আছে।

িবাহসভার চারদিক হট্টগোল; তাহারই মাঝে কন্যার সুপ্রশস্ত খসখসে হাতখানি আমার হাতের উপর পড়িল। এমন আশ্চর্য আর কি আছে, ছোটকালে সাপ দেখিয়াও এমন ভয় পাই নাই । আমার বারংবার মনে হইতে লাগিল, ইহা খাইল আমাকে,খাইল আমাকে। এ যে সস্তা, ইহাই যে মানবী-দানবী, ইহার বহুরূপতার কি অন্ত আছে?

কর্মক্ষেত্রে ফিরিবার পুর্বে আমার শ্বশুর আমাকে বলিলেন, “বাছা যে জিনিস তোমাকে দিলাম তাকে যেন নিয়ন্ত্রণ করিতে পার।”
তাহার পরে তিনি মেয়ের কাছে গিয়া বলিলেন, “বালিকা চলিলাম, তোর একখানি বাপ, আজ হইতে ইহা যদি অন্য কারো সাথে বিনিসূতার বন্ধনে আবদ্ধ হয় বা কোন কিছু খোয়া যায় তার জন্য আমি দায়ী নই।”
শেষে পিতা তাঁহার কন্যাকে নিজের নফস সংযত রাখিতে বলিলেন।

অবশেষে শ্বশুর মশাই আমাকে নিভৃতে লইয়া গিয়া ধমকের সুরে বলিলেন, “ আমার মেয়েটির বড়ই চাইনিজ, ফাস্টফুড খাইবার শখ, মাঝে মাঝে কাটপিসওয়ালা ছিনেমা দেখিতে ও বড় ভালবাসে, স্কুলের মেয়েদের যেমন উপবৃত্তি দেয়া হয় তেমনি আমি তোমাকে প্রতিমাসে ভাতা পাঠাইব, বেহাই জানিতে পারিলে রাগ করিবেন না তো ?”
আমি কিছু আশ্চর্য হইয়া ভাবিতে লাগিলাম, ব্যাটা গোবর গণেশ বলে কি, সংসারে কোন দিক হইতে অর্থসমাগম ঘটিলে বাবা রাগ করিবেন তাহাকে তো এমন রাগী কখনও দেখি নাই। যেন ঘুষ দিতেছেন এমনিভাবে আমার হাতে আটখানা অর্ধশত টাকার নোট গুঁজিয়া দিয়া তিনি সদর্পে প্রস্থান করিলেন।
আমি স্তব্ধ হইয়া ভাবিতে লাগিলাম,“ ইহারা আবার কোন জাতের মানুষ।
বন্ধুদের তো অনেককেই বিবাহ করিতে দেখিলাম। মন্ত্র পড়ার সাথে সাথেই স্ত্রীটিকে একগ্রাসে গলধঃকরণ করা হয়। আমি বিবাহ সভাতেই প্রতিজ্ঞা করিয়াছিলাম, প্রথম দিনেই স্ত্রীকে গ্রাস করিব না। এই ভুল সিদ্ধান্তের কারনেই পরে আমাকে চরম মাশুল দিতে হইয়াছিল। আমি হাড়ে হাড়ে টের পাইয়াছি, সে আমার বিপদ নয়, সে আমার আপদ

‘ওলা বিবি’! না, এ নামটা আর ব্যবহার করা চলিল না। একে তো এটা তাহার নাম নহে তাহার উপরে সে বিষফোঁড়ার মত ধ্রুব সত্য , সে ক্ষণবাসিনী, বর্ষার বিদায়ের শেষ অশ্রু বিন্দুটি নয়। কি হইবে গোপন রাখিয়া, তাহার আসল নাম মনিরা।

দেখিলাম এই আটাশ বছরের মেয়েটির উপর যৌবনের কামদৈত্য আসিয়া পুরাপুরি ভর করিয়াছে, ঠিক যেন মদের বোতল, ঢালিয়া খাইবার অপেক্ষামাত্র কিন্তু এখনো প্রাইমারির গন্ধ যায় নাই। আমার মনে এক ভয় ছিল, গৃহস্থালী কর্ম জানা(আমার ধারনা মতে) বড় বয়সের মেয়ে, কি জানি কেমন করিয়া তাহার মন পাইতে হইবে কে জানে। কিন্তু কিছুদিন বাদেই দেখিলাম, কিছু রূপচর্চার জিনিস পাইয়া মনি আমার বেজায় ভক্ত হইয়া উঠিয়াছে। কবে যে তাহার কালো মনে ধীরে ধীরে রঙ ধরিতে লাগিল, কবে যে তাহার শরীর মন কামনায় বিভোর হইয়া উঠিয়াছে তাহা ঠিক বলিতে পারিব না।

এতো গেল একদিকের কথা। অন্যদিকের কথা বলিবার সময়ও আসিয়াছে। আমার শ্বশুর আন্ডার ওয়ার্ল্ডের গডফাদার (আন্ডার ওয়ার্ল্ড ও গডফাদার শব্দযুগলের অর্থ সে সময় জানিতাম না)। ব্যাংকে যে তাঁহার কত টাকা জমিয়াছে সে সন্মন্ধে জনশ্রুতি নানাপ্রকার অংকপাত করিয়াছে। কিন্তু আবালবৃদ্ধবনিতা সবার সাপেক্ষে কোন অংকটাই বিলিয়ন ডলারের নিচে নামে নাই। এতো বড় ধনীর দুলালীর সহিত আমার জোড়া হইল কেমন করিয়া তাহা অন্য এক উপাখ্যান। যাহোক পরিবারে আমার শ্বশুরের যেমন কদর বাড়িল তেমনি মনির আদরও হইল ঈর্ষণীয়।
এমনি করিয়াই দিন চলিয়া যাইতে পারিত। কিন্তু বাবার মুখে একদিন দেখিলাম ঘোর অন্ধকার। ব্যাপারখানা এই যে বাবা তাঁহার এক দালাল বন্ধুর নিকট হইতে জানিতে পারিলেন আমার বিবাহের সময় দেয়া পঞ্চাশ হাজার টাকাই লোন তুলিয়া দেয়া যাহার সাপ্তাহিক কিস্তিও কম নহে আর বিলিয়ন ডলারের তো কোন খবরই নাই।

সম্পদ লইয়া বাবার সহিত তাঁহার বেহাইয়ের কোন দ্বিপক্ষীয় বৈঠক হয় নাই তবুও বাবা কোন এক লজিকে ঠিক করিলেন বেহাই তাঁহাকে ইচ্ছাপূর্বক প্রতারিত করিয়াছেন।
বাবার একটা ধারনা ছিল আমার শ্বশুর হয়ত বা বড় কোন(ফাইভস্টার) হোটেলের মালিক এবং অন্যান্য ব্যাবসা তো আছেই। খবর লইয়া জানিতে পারিলেন তিনি সেখানকার পাতি মাস্তান। যদিও ইহার পর হইতে বাবা তাঁহার বেহাইকে ভয় করিতে লাগিলেন তথাপিও তাঁহার লোভ ও ক্ষোভ কমিল না। বাবার বড়ই আশা ছিল বেহাইয়ের অনুপস্থিতিতে তিনি হোটেলের মালিকানাপ্রাপ্ত হইবেন।

এমন সময় রাস উপলক্ষ্যে দেশের কুটম্বরা আমাদের বাড়িতে আসিয়া জমা হইতে লাগিল। কন্যাকে দেখিয়া তাহাদের মধ্যে একটা কানাকানি পড়িয়া গেল। এক দিদিমাশ্রেণীয়া কন্যার চুল দেখিয়া বলিলেন , ‘ কি সৌভাগ্য আমার, আমি যে বয়সে নাতবৌয়ের সমান হইলাম” বলিয়া হাসিতে লাগিলেন। কারন মনির চুলেও দু একটা পাক ধরিয়াছিল। অন্য এক ছোট ছেলে ‘বুড়ি বউ, বুড়ি বউ’ বলিয়া চিৎকার করিয়া উঠিল। মা ধমকের সুরে বলিলেন, সে কি কথা! বউমার বয়স সবে তো ষোল বৈ ত নয়। আসছে জুনে সতেরই পা দেবে। খোট্টার দেশে চাইনিজ বিরিয়ানি খাইয়া অমন বাড়ন্ত হইয়াছে। দিদিমারা বলিলেন,বাছা খালি চোখে এখনো বস্তুর অণু-পরপাণু গুনিতে পারি আর ছোকরার বয়স তো কোন ছার; কন্যাপক্ষ নিশ্চয় তোমাদের কাছে বয়স ভাঁড়াইয়াছে।
মা বলিলেন, আমরা যে সার্টিফিকেট দেখিলাম। কথাটা সত্য। তবে সার্টিফিকেটেই প্রমাণ আছে মেয়ের বয়স আটাশ।
এই লইয়া ঘোর তর্ক এমন কি বিবাদ হইয়া গেল।
এমন সময় মনি সেইখানে আসিয়া উপস্থিত হইল। কোন এক দিদিমা জিজ্ঞাসা করিলেন ,নাতবৌ তোমার বয়স কত? মনি বাড়াইয়া কহিল ‘তিরিশ’।
মা ব্যাস্ত হইয়া কহিলেন, তুমি জান না।
মনি কহিল,”আমি জানি, আমার বয়স তিরিশ”
দিদিমারা আনন্দে চুলাচুলি করিলেন।
বধূর নির্বুদ্ধিতায় মা রাগিয়া গিয়া বলিলেন, “তুমি তো সব জান, তোমার বাবা যে কহিলেন তোমার বয়স ষোল।”
মনি চমকিয়া উঠিয়া কহিল, “বাবা বলিয়াছেন! কখনও না”
মা বলিলেন, অবাক করিলে। বেহাই আমাকে নিজের মুখে বলিলেন আর মেয়ে বলে না। এই বলিয়া আবার চোখ টিপিলেন।
মনি এইবার ইশারার মানে বুঝিল। গলার স্বর চড়া করিয়া সে বলিল, ‘ বাবা এমন কথা কখনই বলিতে পারেন না।’
এইবার মা ভীষণ ক্রুদ্ধ হইয়া মনির কান আচ্ছামত মলিয়া দিয়া কহিল, ‘তবে তুই কি আমাকে মিথ্যাবাদী বলিতে চাস ?’
মনি কহিল, ‘আর যাহাই করুক আমার বাবা তো কখনো মিথ্যা বলেন না।’
ইহার পরে মা যতই মনিকে কিল-ঘুষি মারিতে থাকিলেন পরিস্থিতি ততই সাংঘাতিক হইতে লাগিল। মা রাগ করিয়া বাবার কাছে তাঁহার বধূর নির্বুদ্ধিতা এবং ততোধিক একগুঁয়েমীর কথা বলিয়া দিলেন।

বাবা মনিকে ডাকিয়া কহিলেন, ‘ অত্ত বড় বুড়ো গাধীর বয়স তিরিশ এটা কি খুব গৌরবের কথা, তাই মাইকিং করিয়া বেড়াইতে হইবে? আমার এইখানে এইসব চলিবে না, বলিয়া রাখিতেছি’। বাবার কথা শুনিয়া মনির মন ভাঙ্গিয়া খানখান হইয়া গেল।
হায়রে! বউমার প্রতি বাবার আকাশচুম্বি ভালবাসা ভুতলে গমন করিল।

বোকামী করা সত্বেও মনিকে সান্ত্বনা দিয়া আমি বলিলাম, ‘ তোমার কার্যে আমি কখনো বাধা দিব না, আমি যে তোমার রূপে বাঁধা।’ শুনিয়া মনি একটু মুখ ভ্যাংচাইল। সেই গুনাবলী স্বয়ং বিধাতা যাহাকে দিয়াছেন তাহার কোন বর্ণনার দরকার নাই।

একদিন আমাদের বাড়িতে একখানা মুরগী জবাই করা হইল। মা ইহাকে প্রস্তুত করিয়া রান্নার জন্য মনিকে নির্দেশ দিলেন। মনি বলিল, কেমন করিয়া প্রস্তুত করিতে হইবে বলিয়া দাও মা। ইহাতে কাহারও মাথায় পচা ডিম ফাটিবার কথা নহে, ধনীর দুলালী, কুটা ছিঁড়িয়া কখনো দুটা করে নাই। কেবল মনির কর্মদক্ষতা যাচাই করিবার জন্যই এমন আদেশ করা হইয়াছে।
সকলেই গালে হাত দিয়া বলিলেন, ওমা কোন অকর্মার ঘরে ইহার জন্ম ? ইহার পরে পিতাকে কটাক্ষ করিতেই মনি ভীমমূর্তী ধারন করিয়া বলিল, আপনার সকলেই জানেন, সে দেশে সবাই আমার বাবাকে ক্যাডার বলিয়া জানে। কথা শুনিয়া সেইখানে হাসির রোল পড়িয়া গেল।
তাহার পরে মনির বাবার উল্ল্যেখ হইলেই বলা হত ‘তোমার ক্যাডার বাবা’।

অন্তঃপুরে মনির একজন প্রকৃত অনুরাগী ছিল, সে আমার ছোট ভাই গদাধর। ভাবির সহিত অশ্লীল হাসি-তামাশার জন্য ইহাকে কতবার যে পিটানো হইয়াছে তাহার কোন ইয়ত্তা নাই।

বাড়িতে তখন নববধূর অকল্যাণে অশান্তির বাতাস হইতে শুরু করিয়াছে ।
আমার সবচেয়ে ভাল বন্ধু বক্ষিল চন্দ্র রায়, একদিন আমাকে বলিলেন, কি মশায়! বউয়ের সহিত কেমন মজা হইতেছে? আমি মিথ্যা করিয়া বলিলাম- মন্দ না। ইহার পরে জিদ ধরিল সে মনিকে দেখিতে যাইবে। আমি অমত করিলাম না।
নির্ধারিত দিনে বন্ধু উপস্থিত হইল। সবকিছু পূর্ব হইতেই ঠিকঠাক করা ছিল। প্রথমবার বক্ষিল যখন মনির মুখামুখি হইল তখন এমনভাবে তাহার দিকে তাকাইয়া ছিল যে, সে যেন অমৃতলোকের সন্ধান পাইয়াছে। ইহার পরে আহার ও অনেক গল্প-গুজব হইল। তাহার পর বিদায় জানানোর জন্য আমি বন্ধুর সহিত কিছুদুর গমন করিলাম। বিদায়কালে বক্ষিল আমাকে অত্যন্ত দূর্বল চিত্তে কহিল, দোস্ত ভাবিকে অনেক পছন্দ হইয়াছে।
আমি ভাবিলাম কৈশোরকালে কিশোরেরা যোগ্যতা ছাড়াই বিপরীত লিঙ্গের যে কোন একটির জন্য জীবনবাজি রাখিতে চায় আবার কিশোরীরাও অযোগ্য নির্বোধের হাতে নিজেকে সমর্পন করিতে লজ্জাবোধ করে না। কিন্তু এই অপদার্থ কি দেখিয়া মনিকে পছন্দ করিল তাহা ভাবিয়া পাইলাম না। যাই হোক আমারই তো বউ! ইহা লইয়া আমি আর বেশি মাথা ঘামাইলাম না।

ইহার পর হইতে নানা ছলে বক্ষিল আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করিতে লাগিল এবং দিনে দিনে মনির প্রয়োজনীয় প্রসাধনী জিনিসের চাহিদা কমিতে আরম্ভ করিল। স্ত্রী আর আমাকে অহেতুক জ্বালাতন করে না দেখিয়া মনে মনে তৃপ্ত হইয়াছিলাম। কিন্তু আমার এই তৃপ্তিই যে একদিন বিষের পেয়ালায় রূপান্তরিত হইবে তাহা কোনদিনও স্বপ্নেও কল্পনা করিতে পারি নাই। বাড়িতে বন্ধুর ঘন ঘন আগমন করার ফলে সবার মনে সন্দেহের বহ্নিরেখা স্পষ্ট হইতে স্পষ্টতর হইতে লাগিল। এমনিতেই সবার সহিত মনির শীতল সম্পর্ক, তাহার মধ্যে এই অনাকাংখিত ঝামেলা জুটিয়া পরিস্থিতি যেমনটা মারাত্মক করিয়াছিল তেমনি আমাদের বন্ধুত্বের মাঝেও ভাটা পড়িতে লাগিল।

মনি সর্বদা মুখ ভার করিয়া থাকে, আমার সহিতও ভাল করিয়া কথাটি পর্যন্ত বলে না, আগের মত সপ্তাহে আর পাঁচটি সিনেমা দেখিতে যাওয়া হয় না; চারিদিকে শুধু তুষের আগুন আর তুষের আগুন। আটাশ বছর ব্যাপিয়া যে গিরিপথের অধিকারিনী স্বেচ্ছাচারিতায় মানুষ হইয়াছে সে-ই আজ সামাজিক বাধায় আটকা পড়িয়াছে।

দিনে দিনে মনি হাড্ডিসার হইতে লাগিল তাহা আমরা প্রতিদিনের অভ্যাসবশঃত বুঝিতে পারি নাই। একদিন মাঝরাতে ঘুম হইতে উঠিয়া দেখি বিছানায় মনি নাই, আমার বুকের ভিতরটা ধক করিয়া উঠিল। বাহিরে গিয়া দেখি সে আকাশের পানে চাহিয়া তারা গুনিতেছে আর তাহার কাল্লামোবারকের চুল এলোমেলোভাবে ছড়াইয়া রহিয়াছে।

ইহার কিছুদিন পর বলা নাই কওয়া নাই আমার শ্বশুর আমাদের বাড়িতে আসিয়া উপস্থিত হইল। মনির শুকনো চেহারা দেখিয়া প্রথমেই তিনি তুলকালাম কান্ড ঘটাইলেন।“আমার মেয়ের এমন পরিস্থিতি কেন” ইত্যাদি ইত্যাদি প্রশ্নবানে তিনি বেহাই-বেয়ানকে ধমকাইতে লাগিলেন, বাবার উপস্থিতিতে পূর্ণশক্তি পাইয়া মনিও গর্জিয়া উঠিয়া বলিল, এইবার আমি বাবার সাথে যাইবই, দেখি আমাকে কে আটকায়। তামাশা দেখিতে দু-চারজন লোক পর্যন্ত জমা হইয়া গেল। আমি আর ঠিক থাকিতে পারিলাম না, উত্তেজিত হইয়া বলিলাম, মনি! বেশি চেঁচামেচি করিলে দড়ি দিয়া তোমাকে বাঁধিয়া রাখিব। বাবা এইবার সাহস পাইলেন। নিজ বাড়িতে যে বেহাই তাঁহাকে ধমক দিয়াছেন তাঁহার উপর তিনি আক্রোশে ফাটিয়া পড়িলেন। অবস্থা বেগতিক দেখিয়া আমার শ্বশুর নিশ্চুপ হইলেন। অতঃপর বিদায় লইবার জন্য তিনি কন্যার নিকটে গেলেন। কিন্তু মনি হঠাৎ কেন জানি ভর্ৎসনার সুরে বলিল, বাবা আমার জন্য যদি আর কোনদিনও তুমি এমন ছুটাছুটি করিয়া এ বাড়িতে আসো তাহলে বাড়ির পোষা কুকুর ভুলুকে তোমার পেছনে লেলিয়ে দিব। আর বাপ অপমানের হাসি হাসিতেই হাসিতেই বলিলেন, ফের যদি আসি তবে হেভি মেশিনগান সঙ্গে করিয়াই আসিব।

তাহার দুইদিন পরে কর্মক্ষেত্র হইতে ফিরিয়া আসিয়া যাহা শুনিলাম তাহাতে আমার হৃৎপিন্ডে গ্রেনেড হামলা হইল। আমারই বন্ধু বক্ষিল! আমারই এতো বড় সর্বনাশ করিতে পারে! ক্ষণিকের জন্য আমার সংজ্ঞা লোপ পাইল।
ইহার পর হইতে মনির সেই তরমুজের বিচির ন্যায় দাঁতযুক্ত মুখের হাসিটুকু আর একদিনের জন্যও দেখি নাই।
তাহার পরে যে কান্ডটা ঘটিয়াছে তাহা লজ্জায় এখানে বলিতে পারিব না।
থাক, শুনিতেছি মা পাত্রীর সন্ধান করিতেছেন। হয়তো মার আদেশ একদিন পালন করিব। কারন সে যদি পারে তবে আমার তাহাতে দোষ কি?

এফ এইচ রিগ্যান
২০০৫

টাকা দিবার কথা ছিল জানুয়ারির তেইশ তারিখে, ঘোষণাটাও দেওয়া হইয়াছে অনেক আগেই, কিন্তু তেইশ তারিখের একদিন আগে জানা গেল নির্ধারিত দিনটি শুক্রবার; দিনমজুর ব্যাতিত আর সবার কর্মক্ষেত্র বন্ধ। সুতরাং সেদিন টাকা আদান-প্রদান করা গেল না এবং নূতন তারিখ নির্ধারিত হইল পঁচিশে জানুয়ারি।
আমি দিনমজুর নই আবার অন্যকোন প্রকারের উপার্জনকারীও নই, ছাত্র মানুষ; আয় না থাকিলেও ব্যায়টা কখনো স্থগিত হয় না। তেইশ তারিখে টাকা প্রপ্তির যে কথা ছিল তাহা বৃত্তি বাবদ। ইহাও এক প্রকার আয় এবং তাহা কোন কোন খাতে ব্যায় করিব তাহার রূপরেখা কয়েকদিন পূর্বেই ডিজাইন করিয়া রাখিয়াছি।
যে প্রতিষ্ঠান হইতে বৃত্তির টাকা প্রদান করা হইয়া থাকে তাহার কর্মকর্তাদের সময় জ্ঞান অতিশয় উঁচু মাত্রার নহে। সুতরাং নির্দিষ্ট দিনটিতে একটু দেরি করিয়াই ঘুম হইতে উঠিলাম।
সাড়ে দশটা বাজিয়াছে তবুও সূর্য ওঠে নাই। আমি শীতবস্ত্র পরিধান করিয়া বাহির হইলাম। বৃত্তি এই এলাকা হইতে আমি একাই পাই নাই, পাশের গ্রামের অন্য একজনও পাইয়াছে। আগের সন্ধ্যাতেই তাহার সহিত কথা হইয়াছে যে আমরা একইসঙ্গে টাকা লইতে যাইব।
গতদিনের কথা ভুলিয়াছে ভাবিয়া তাহাকে ফোন করিতেই বলিল,‘‘ ভাই আপনি বাসস্ট্যান্ডে গিয়া দাঁড়ান আমি এক্ষুণি আসছি।’’ আমি বাসস্ট্যান্ডে গিয়া অনেক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকিলাম কিন্তু উহার আগমন ঘটিল না। আমি আবার ফোন করিতেই বলিল,‘স্যরি ভাই আমার দেরি হবে, আপনি চলে যান।’
যে দেরি করিতে চায় তাহাকে পীড়াপীড়ি করা অনুচিত। আমার দেরি করা সম্ভব নহে, অনেক কাজ পড়িয়া আছে, নেগেটিভ হইতে ছবি ওয়াশ করিতে হইবে, ফোনের সীম সংক্রান্ত ব্যাপারে ফোন অফিসে যাইতে হইবে, হাসপাতালে চর্মরোগের ডাক্তারের কাছে যাইতে হইবে আর এক বান্ধবীর সহিত দেখা করিতে হইবে। সুতরাং আমাকে অধিক সময়জ্ঞানী সাজিতে হইল।
যতগুলি কাজ সমাধা করিব বলিয়া স্থির করয়িাছি তাহার মধ্যে সবচেয়ে আকর্ষণীয় হইতেছে বান্ধবীর সাক্ষাৎলাভ। শুধু সাক্ষাতই ঘটিবে না, আমার অন্যান্য কাজে সেদিন সে স্বশরীরে উপস্থিত থাকিবে বলিয়াও কিছুদিন আগে ফোনে কথা হইয়াছিল। কিন্ত এই প্রাপ্তিযোগ যে আমার জন্য অতিশয় ভাগ্যের ব্যাপার এবং অসম্ভব তাহা অনেক আগেই অনুমিত হইয়াছিল। এইরকম মনে হইবার উপযুক্ত কারণও বিদ্যমান আছে।
বেশ কয়েক মাস পূর্বে উক্ত বান্ধবীটির আমন্ত্রণে আমার এক বন্ধু সহযোগে তাহাদের কলেজে গিয়াছিলাম। এই কলেজে আমি একসময় পড়িয়াছি কিন্তু অতিথি হইয়া আসিয়া পূর্বেকার একই কক্ষ এবং উহার মধ্যস্থিত আসবাব নূতন উৎসাহে নিরীক্ষন করিতে লাগিলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ থাকিতে পারিলাম না, বান্ধবীর ব্যাবহারিক ক্লাস থাকায় আমাদের স্থান হইল মাঠে। আমি একখানা খবরের কাগজ কিনিয়া মাঠে বসিয়া পড়িতে লাগিলাম। ক্ষাণিকবাদে পাশেই কিছু দূর্গন্ধ আবিষ্কার করিলাম। আমি ইহার তোয়াক্কা না করিয়া পড়িতেই থাকিলাম। কিন্তু দূর্গন্ধ যখন প্রকট আকার ধারণ করিল তখন আশেপাশে নিরীক্ষণ করিতেই একখানা মৃত চিকার অর্ধগলিত মৃতদেহ খুঁজিয়া পাইলাম। আমি তৎক্ষনাৎ ঐ স্থান ত্যাগ করিয়া অন্য একটি ছায়াযুক্ত স্থানে বসিলাম, কিন্ত ছায়া বেশিক্ষণ থাকিল না, রৌদ্র আসিয়া তাপ ছড়াইতে লাগিল। এইরকম হরেক ঝঞ্ছাটে আমার অনেক্ষণ সময় পার হইল। আমি অবস্থা জানিবার জন্য বান্ধবীকে যতবারই ফোন করিলাম ততবারই সে বলিল,‘এই হয়েছে,যাচ্ছি, আর আধ ঘন্টার মত।’ এইরূপে প্রায় চার ঘন্টা সময় অপেক্ষায় কাটিয়া গেল। এই দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করিয়া চিত্ত যে সম্পূর্ণ ক্রোধান্ধ হইয়াছে তাহা নহে বরং আমি ভাবিতেছিলাম অমর প্রেমিক মজনুও যেইখানে তাঁহার প্রেমিকার জন্য এতক্ষণ এইভাবে সময় অপচয় করিবার প্রয়াস পায় নাই সেইখানে সামান্য বান্ধবীর জন্য এই ধৈর্য্য বিশেষ প্রশংসার দাবি রাখে।

যে বন্ধুটি আমার সহিত আসিয়াছিল ব্যাক্তিগত কাজে সে বেশিরভাগ সময়ই দূরে ছিল। ব্যাবহারিক ক্লাস শেষে তাহারা যখন বাহিরে আসিল তখন দুইটা বাজে। এতক্ষণ বসিয়া থাকিয়া পূনর্বার বসিবার ইচ্ছা যদিও আমার ছিল না তবুও মনে বড়ই আশা ছিল, এই কলেজে থাকিতে কোন সহপাঠীনির সহিত কথাটি পর্যমত্ম বলিতে পারি নাই, কিন্তু আজ যাহার জন্য চার ঘন্টা অপেক্ষা করিলাম সে বান্ধবীসমেত অথবা ছাড়া অমত্মঃত চার মিনিট সময় ধরিয়া আড্ডা দিবে। সময় অবশ্য পরে চার মিনিটের বেশি ধরিয়াই পাইয়াছি; আড্ডারূপে নহে, অন্যরূপে। ভাগ্য যিনি নিয়ন্ত্রন করেন তিনি দেবতা নাকি দেবী জানিনা কিন্তু যাহাই হোন না কেন তাহার সহিত আমার শত্রতা আজন্মকাল, তিনি এমন পরিবেশ সৃষ্টি করেন যে, আমি নিগৃহীত হই ঠিকই কিন্তু নিগৃহকারীকে দোষারোপ করিবার উপায় থাকে না।
একে তো তখন ছিল রমজান মাস, বৈকালে মেয়ে মানুষের গৃহস্থালি কাজ বাড়িয়া যায় তাহার উপর সকাল হইতে ক্লাস করিয়া আবার আড্ডা দিবার ধৈর্য্য তাহাদের না থাকাই স্বাভাবিক। ক্লাস শেষে উহারা যখন হাঁটা দিল তখন আমরাও দুই বন্ধু তাহাদের সহিত মিলিত হইয়া নিঃশব্দে চলিতে লাগিলাম।
এই স্থলে আমার বেশভূষার কথা বলা দরকার; মুন্ডণকৃত মাথায় ছোট ছোট চুল গজাইয়াছে কিন্তু পাঁচড়াযুক্ত ত্বক সহজেই দৃশ্যমান, গাল বসিয়া মুখমন্ডল নবীন গাঁজাখোরের ন্যায় হইয়াছে আর হাড্ডিসার দেহ যে শার্ট দ্বারা আবৃত ছিল তাহা আবৃত বস্ত্তর চেয়ে অধিক উন্নত নহে, সর্বোপরি থালা হস্তে ঘুরিলে অতিশয় কৃপনও পয়সা দিয়া করুণা করিতে দ্বিধা করিত না।
যাহাই হউক আমরা সরাসরি বাসস্ট্যান্ডে গেলাম না, কাহার জন্য যেন শার্ট কিনিবার দরকার হইলে মার্কেটে গেলাম। আমি এবং আমার বন্ধু তাহাদের সঙ্গ ত্যাগ করিলাম না এই জন্য যে বান্ধবী থাকিতে বলিয়াছিল তাই, আর তাহার সহপাঠীনিদের চোখ স্পষ্ট বলিতেছিল ‘আপদ পিছু ছাড়িতেছে না কেন’ কিন্তু মুখে কিছুই বলিল না।
শার্ট পর্ব শেষ হইলে আমরা আসিলাম বাস ধরিতে। অনেক্ষণ অপেক্ষার পরও বাস যখন আসিল না তখন ভ্যান ঠিক করিতে হইল। আমার মনে হইল কলেজ মাঠে বসিতে পারি নাই, এইবার ভ্যানে একসাথে বসিয়া দইয়ের সাধ ঘোলে মিটাইব। কিন্তু তাহাও ভাগ্যে জুটিল না। ভ্যানে ইতিমধ্যে পাঁচজন বসিয়াছে; এক ভ্যানে সর্বোচ্চ ছয় জনেরে জায়গা হইবে, শেষে বেশি হইলাম আমিই। ঐ মুহুর্তে আমার ‘সোনার তরী’ কবিতাটা মনে পড়িল। রবি ঠাকুর উহা যদি না লিখিতেন তবে ‘সোনার ভ্যান’ শিরোনামে ‘ঠাঁই নাই ঠাঁই নাই ছোট সে ভ্যান’ কবিতা রচনা আমার পক্ষে অসম্ভব কিছু ছিল না।
শেষে বান্ধবীসমেত ভ্যান স্থান ত্যাগ করিল কিন্তু যে বন্ধু আমার সহিত আসিয়াছিল সে আমাকে ত্যাগ করিয়া তাহাদের সহযাত্রী হইল না।
আমরাও একখানি ভ্যান ঠিক করিয়া তাহাদের ভ্যানের সঙ্গে সঙ্গে যাইবার জন্য ভ্যানওয়ালাকে বলিলাম, কিন্তু মাত্র দুইজনকে লইয়া যাইতে তিনি সম্মত হইলেন না । বেশ কিছুক্ষণ অপেক্ষার পরও যখন আর যাত্রী জুটিল না তখন সকল বিরক্তি অবসান ঘটাইয়া আমাদের যাত্রা আরম্ভ হইল। আমাদের ভ্যান যখন বান্ধবীদের ভ্যানের কাছাকাছি আসিল তখন দেখিলাম যাত্রীরা নিজেদের মধ্যে হাসাহাসি করিতেছে আর অবসরে আমার সহিত যাহা কিছু কথা হইল তাহা নিত্যান্ত ভদ্রতাবশঃত। আমাদের ভ্যানওয়ালার ইচ্ছা ছিল ঐ ভ্যানের সাথে সাথেই গমন করা, আমিও অনুরূপ ইচ্ছাই পোষণ করিয়াছিলাম; কিন্তু হঠাৎ আমার ভীষণ জিদ চাপিল, দর্পিত বিধি আমাকে পদে পদে অপমান করিতেছে করুক কিন্তু অপমানের ষোলকলার যে স্বাদ, তাহাকে কোনক্রমেই তাহা পাইতে দিব না। আমি পকেট হইতে মোবাইল বাহির করিয়া এক ফুপাতো বোনকে ফোন করিলাম আর ভ্যানওয়ালাকে বলিলাম ধীরে চালাইয়া আপনার সময় নষ্ট করিবার দরকার নাই, জোরে চালান। এতক্ষণে আমার কথা বলা আরম্ভ হইয়াছে এবং আমাদের ভ্যান উহাদের ভ্যানকে পাশ কাটাইয়া দ্রততর গতিতে চলিতে লাগিয়াছে যেন আমিই ইহাদের কাউকে পাত্তা দিলাম না।
সেই দিন কলেজের মরা চীকার দূর্গন্ধ হইতে দুরে সরিবার বুদ্ধি আমার হইয়াছিল কিন্তু মরিচীকা আমার পিছু ছাড়িল না। অনেকদিন পরে জানিয়াছি যে আমাকে দেখিয়া সহৃদয়বান বান্ধবীর এমন মায়া হইয়াছে যে, তাহার ফোনবুকে আমার ফোন নম্বর উঠিবার সৌভাগ্য অর্জিত হইয়াছে। আরো একখানা গোপন কথা যাহা আমার কল্পনাতেও আসে নাই এই যে, আমি সেদিন যে চার ঘন্টা সময় ব্যায় করিয়াছি তাহা এমনি এমনিই নহে, বান্ধবীর এক সহপাঠীনির জন্য এরূপ ধৈর্য্য ধরিয়াছি। সেই সহপাঠীনির বিবাহ হইয়াছে তবুও তাহার আশা ছাড়িতে পারি নাই বলিয়াই এমন অপকর্ম আমার দ্বারা সংঘটন সম্ভবপর হইয়াছে।
হায়! স্বপ্নেও যাহার আশা কখনও করি নাই, তাহার ক্ষেত্রে আশা ছাড়িবার প্রশ্নটা আমার জন্য কতখানি পীড়াদায়ক এবং দূর্বোধ্য তাহা কেবল উপরওয়ালাই ভাল বুঝিবেন। তবে আমি যাহা হৃদয় দিয় অনুভব করিলাম তাহা হইতেছে এই যে, সেইদিন ষোলকলার স্বাদ বিধিকে পাইতে দিই নাই কিন্তু তদস্থলে সতেরকলার স্বাদ কখন যে তিনি আস্বাদন করিয়াছেন তাহা ঘুণাক্ষরেও টের পাই নাই। আমি মনে মনে বলিলাম, ‘‘ ঈশ্বর অত রঙ্গশালী হইও না, তোমার বিচার করিবার কেহ নাই বলিয়া আমাকে যেমন খুশি তেমন অপদস্থ করিতেছ, কর; কিন্তু যেদিন নজরুলের বিদ্রোহী হইব সেদিন আমিও তোমার বক্ষ বিদীর্ণ করিয়া উল্লাসে ফাটিয়া পড়িব।’’

ইহার পরে বহুদিন গত হইয়াছে, উক্ত ঘটনা যখনই মনে পড়িত তখনই বুকের ভিতর খচ্খচ্ করিত। আজও ঐরূপ যে ঘটিবে না তাহার কোন নিশ্চয়তা নাই, সুতরাং মনে করিলাম আমি যাচ্ছি আমার কাজে, বান্ধবীর সহিত দেখা হইলে সেটা হইবে উপরি পাওনা।
আমি যখন বৃত্তি অফিসে পৌঁছাইলাম ততক্ষণে বৃত্তি প্রদান শুরু হইয়াছে। আমার সিরিয়াল নম্বর সবার শেষের দিকে, টাকাও পাইব শেষের দিকে। কিন্তু অতক্ষণ দেরি করিলে কোন কাজই হইবে না, বিশেষত যে বান্ধবীর সহিত দেখা করিতে যাইতেছি সে একটার মধ্যেই ক্লাস শেষ করিয়া বাড়ি ফিরিয়া আসিবে। আমি স্থির করিলাম সিরিয়ালের তোয়াক্কা না করিয়া আগেই যোগাযোগ করি, কিন্তু সাহস হইল না। অস্বস্তির মধ্যে অনেক্ষণ সময় পার করিলাম।অবশেষে ধৈর্যের বাঁধে যখন ফাটল দেখা দিল তখন সুযোগ আসিল। আমার এক পরিচিত বৃত্তিভোগীর নাম যখন ডাকিল তখন আমিও তাহার পিছু পিছু উঠিয়া গেলাম। নাম ডাকিল একজনের কিন্তু গেল দুইজন; দুইজনের হয়তো একই নাম কিন্তু একজনকে যথাস্থানে ফিরিয়া আসিয়া আবার অপেক্ষা করিতে হইবে, যে ফিরিয়া আসিবে তাহার বিড়ম্বনা কল্পনা করিয়া ঘরের আর সবাই মৃদু শোরগোল উৎপন্ন করিল। কিন্তু অনুরোধ গ্রাহ্য করিয়া আমাকেও যখন টাকা প্রদান করা হইল তখন সবাই নিশ্চুপ হইল; এ স্থলে কোন রঙ্গ হইল না।
অতঃপর টাকা পাইয়াই সঙ্গে সঙ্গে জেরা সদর অভিমুখে রওয়ানা হইলাম। আমি যখন পৌঁছিলাম তখন ঘড়িতে সাড়ে বারোটা বাজিয়াছে। শুরুতেই ছবির কথা মনে পড়িল। যে দোকানে ভালভাবে ছবি ওয়াশ করা হয় সেইখানে গিয়া দেখিলাম দোকান সম্পূর্ণ খালি, সামনের দিকটা কতিপয় ব্যানার দ্বারা আচ্ছাদিত। ইহা যে কোনকালে ছবি ওয়াশের জায়গা ছিল তাহা তাহা শুধু ঘর মধ্যস্থিত দেয়ালসংযুক্ত শেল্ফ দ্বারা প্রতীয়মান হইতেছিল। এককালে যাহা সুন্দর সুন্দর ছবি দ্বারা সুসজ্জিত ছিল আজ আমার বেলায় তাহা ধুলাবালিতে পূর্ণ হইয়া রহিয়াছে। আমি অন্য দোকান না খুঁজিয়া বান্ধবীর অবস্থান জানিবার জন্য ফোন করিতেই সে বলিল ‘নিউমার্কেটের সামনে দাঁড়াইয়া থাক। কিন্তু আমি যে নিউমার্কেট চিনিনা তাহার উল্লেখ করিতেই সে তাহা চিনিবার উপায় হিসাবে বলিল, ‘দেখ মার্কেটের প্রধান ফটকে এক নং গলি কথাটা লেখা আছে্।’ অনেক্ষণ অন্বেষণ করিবার পর যখন এক নং গলি খুঁজিয়া পাইলাম তখন দেখিলাম যে আমি এতক্ষণ ধরিয়া নিউমার্কেটের পাশেই ঘুরপাক খাইতেছি।
কিছুক্ষণবাদেই বান্ধবী তাহার সহপাঠীনি সহযোগে আবির্ভূত হইলে আবিষ্কার করিলাম দলে শুধু মেয়ে মানুষই নাই, এক প্রাক্তন বান্ধবীর নূতন বিবাহিত স্বামীও দলের শোভা বাড়াইতেছে। দুলাভাইয়ের সাহচর্যে শ্যালিকার আপেক্ষিক মুল্য অন্যান্য সময়ের তুলনায় অত্যন্ত বেশি এবং যে শ্যালিকা বউয়ের বান্ধবী তাহাদের ভাব বর্ণনা করা সাধ্যাতীত ব্যাপার। শ্যালিকারূপী বান্ধবীর সহিত সৌভাগ্যের জোরে আমার কিছু কথা হইল এবং ক্ষাণিকবাদে যখন রেস্তোরায় চা খাইবার সম্ভাবনা প্রবল থেকে প্রবলতর হইতে লাগিল তখন বান্ধবীসহযোগে আপন কর্মসম্পাদনের আশা সম্পূর্ণ ত্যাগ করিয়া ছবি ওয়াশের দোকান সন্ধান করিতে পাশের গলিতে আমি দ্রুত মিশিয়া গেলাম।
ক্ষাণিকক্ষণ চরকির মত এদিক সেদিক ঘুরিয়া অবশেষে একখানা উপযুক্ত দোকান খুঁজিয়া পাইলাম। কোন নেগেটিভ ওয়াশ করিতে হইবে তাহা দোকানদারকে ভালোমত বুঝাইয়া দিয়া হাসপাতালের উদ্দেশ্যে আমি রিক্সা ধরিলাম। হাসপাতালের বহির্বিভাগে ডাক্তারের কাছে যাইবার টিকিট বিক্রয় হয় যেইখানে, সেইখানে গিয়া দেখিলাম টিকেট বিক্রেতা নাই কিন্তু উহার পাশে লেখা ‘পুরুষদের টিকিট জরুরী বিভাগের সামনে দেওয়া হইতেছে।’
নির্দেশমত জরুরী বিভাগের সামনে গিয়া দেখিলাম শূন্য টিকেট কাউন্টারে একখানা চেয়ারও নাই। জরুরী বিভাগের সবাই জরুরী কাজে অন্য কোথাও গিয়াছে ভাবিয়া আমি আবার পূর্বের স্থানে আসিয়া কর্তৃপক্ষের এক লোককে ব্যপারটা জিগ্যাসা করিতেই বলিল ‘টিকিট এখানেই দেয় তবে সাড়ে বারোটা পর্যন্ত।’
আমি তাহার কথা শুনিয়া স্তব্ধ হইয়া গেলাম। ইস আর বিশ মিনিট আগে আসিলেই এই সর্বনাশ হইত না, রাগের চোটে মনে হইল মাথার চুল টানিয়া ছিঁড়ি; কিন্তু তাহা হইল না, কারন সময় নাই, আরো অনেক কাজ পড়িয়া আছে ।
হাসপাতাল হইতে ফোন অফিসে গিয়া আমি বলিলাম যে, প্রত্যেকদিন আমার ফোনে একটি করিয়া কৌতুক পাঠানো হয়, প্রত্যেকবারই অনেক টাকা কাটে; টাকা দিয়া কৌতুক খরিদ করিবার সামর্থ্য আমার নাই, পত্রিকায় ইহা বন্ধ করিবার যে নিয়ম দেয়া আছে সেই নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করিয়াছি কিন্তু তাহাতেও টাকা গচ্ছা গিয়াছে উপরন্তু কৌতুক প্রদানকারী কর্তৃপক্ষের সহিত যে আমি সংযুক্ত নই এই ডাহা মিথ্যা তথ্য দিয়া আমার কাছে বার্তা পাঠানো হইয়াছে কিন্তু অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় এই যে ইহার পরেও যথারীতি কৌতুক আসিতেছে এবং টাকা কাটিতেছে।
অভিযোগ শুনিয়া চাকমা মতন সেবাদানকারিনী একখানা ফোন নম্বর দিয়া বলিলেন, ‘‘এই নম্বরে ফোন করে নির্দেশমত কাজ করুন।’’
আমি নম্বরটা লইলাম ঠিকই কিন্তু সন্তুষ্ট হইতে পারিলাম না। কোন একটি নম্বরে ফোন করিয়াই যদি তাবৎ সমস্যার সমাধান মেলে তবে তাহা পত্রিকার মাধ্যমে সবাইকে জানালেই হয়, গ্রাহকসেবা অফিস বানাইবার দরকার কি ?
কৌতুক সবাই করিল, প্রকৃতিও যে আমার সহিত কৌতুক করিতেছে তখনও তাহা টের পাই নাই। হাসপাতালে কাজ হইল না, সীমের সমস্যাও মিটিল না; আমি গেলাম ছবির দোকানে। এক ঘন্টা পরে ছবি দিবার কথা, আমি একঘন্টা পরেই আসিয়াছি কিন্তু দোকানী বলিল আরো আধাঘন্টা পরে আসিতে। কো কাজই ঠিকঠাক হইতেছে না, আমার মাথা বোঁবোঁ করিয়া ঘুরিতে লাগিল। যে বান্ধবীকে অনেক্ষণ আগে ছাড়িয়া আসিয়াছি, অবস্থান জানিবার জন্য তাহাকে আবার ফোন করিলে সে বলিল যে তাহারাও অনুরূপ সময় পরে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হইবে।
আমি আবার অপেক্ষা আরম্ভ করিলাম। আধাঘন্টা পরে আমার পছন্দের সেই ছবি আসিল। কিন্তু একি ! এতক্ষণ ধরিয়া পন্ডশ্রম করিয়া ভাবিলাম ছবি লইয়া খুশি মনে বাড়ি ফিরিয়া যাইব, হায় পোড়া কপাল আমার তাহাও হইল না। আমি যে ছবি ওয়াশ করিতে দিয়াছি তাহাতে আমি ও আমার বড় বোন আছে, অনুরূপ একটা ছবি একই সারির বিপরীত প্রান্তে ছিল যেইখানে শুধু আমার স্থলে আমার এক বন্ধু আছে। নির্বোধ দোকানদার আমারটা না করিয়া তাহারটা করিয়াছে। এইরূপ যে ঘটিতে পারে তাহা আশংকা করিয়া দোকানীকে বারবার সাবধান করিয়া দিয়াছি কিন্তু ফল হইল একই। এইবার আমার ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙ্গিয়া গেল, কিন্ত প্রকৃত বীরেরা নাকি রাগের সময়ও সংযমী থাকে তাই আমি অসংযমী হইলাম না, তথাপিও দোকানদারকে রাগের কিয়দংশ দেখাইতে ছাড়িলাম না।
সকল কর্ম সাঙ্গ হইয়াছে, এইবার গৃহে ফিরিয়া যাইবার পালা। যাহার সঙ্গ পাব বলিয়া আশা করিয়াছিলাম তাহর সহিত ভালো মত কথাই হইল না। শেষকালে তাহার সহযাত্রী হইব এই ঢের। আমি আবার বান্ধবীকে ফোন করিলাম, ফোন ধরিতেই ‘ভটর ভটর’ শব্দ শুনিয়া ভাবিলাম ইহারা হয়তো টেম্পোর পাশে দাঁড়াইয়া আমার জন্য অপেক্ষা করিতেছে। কিন্তু আমার নাম সম্বোধন করিয়া বান্ধবী যখন বলিল, ‘‘আমি টেম্পোতে যাচ্ছি, তুমি বাস ধরে চলে আসো’’, তখন আমার মাথায় আকাশ ভাঙ্গিয়া পড়িল।
আমি ফোন রাখিয়া আকাশপানে তাকাতেই অনুভব করিলাম কেহ একজন অট্টহাস্যে বিপুলবেগে শরীর দোলাইতেছে। আমিও হাসিলাম কারণ শেষে আমারও আশা ভঙ্গ হয় নাই।
মনে অনেক বিরক্তি আসিলে গান শুনিতে হয়। পকেট হইতে ইয়ার ফোন বাহির করিয়া গান জুড়িতেই কানে ভাসিয়া আসিল ‘তুমি কি কেবলই ছবি, পটে লিখা নাম..........।’ যে ছবি লইয়া এতকিছু হইল আবার সেই ছবিরই গান। ‘ধুর’ বলিয়া আমি গান বন্ধ করিলাম।
বাস আসিলে চলিয়া যাইব, কিন্তু বাস আসিল না, অপেক্ষাও শেষ হয় না। সামনে শ্যালো ইঞ্জিন চালিত টেম্পু দুইজন যাত্রি লইয়া দাঁড়াইয়া আছে; আমি তাহাতে উঠিলাম না কারন অনেক দিন আগে ঐরূপ টেম্পু দূর্ঘটনায় আমার এক আত্মীয় মারাত্মক যখম হইয়াছিল এবং সেই থেকে তাহাতে চড়িবার কথা মনে হইলেই ভীষণ ভয় করিত। এদিক সেদিক ছুটাছুটি করিতে করিতে একসময় চীরপ্রতিযোগী ফুফুত বোন মহুয়াকে ফোন করিলাম। ইহার সহিত আমার স্নায়ুযুদ্ধের খবর সর্বজনবিদিত। আজ এত হেনস্থার দিনে কেন জানি এই শত্রুর কথা গভীরভাবে মনে পড়িল।আমি তাহাকে ফোন করিয়া বলিলাম ‘আজ দারুণ একটা দিন পার হল, তোকে মনে পড়ল তাই ফোন করলাম।’ জবাবে প্রতিপক্ষ স্নায়ুযোদ্ধা আস্তে করিয়া বলিল ‘‘মনে তাহলে পড়ে ?’ সরল কথার খোঁচাটা কেবল আমিই অনুভব করিলাম, বলিলাম ‘ঠিক মনে পড়ে না তবে এই মুহুর্তে আমি এত আনন্দিত যে একখানা কোদাল পাইলে বিনা স্বার্থে পাতাল পর্যন্ত খুঁড়িবার সামর্থ রাখি।
একসময় দাঁড়িয়ে থাকা সেই টেম্পুটি ভোঁ ভোঁ শব্দে চলিয়া গেল। বাস এতক্ষণেও আসিল না আবার সেই টেম্পুটিও চলিয়া গেল; আমি রাগে উঁহু বলিয়া পরের টেম্পুতে গিয়া বসিলাম।
এমনিভাবে বিচিত্ররকম অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করিয়া যখন আমি বাড়ি পৌছাইলাম তখন বৈকাল হইয়াছে। অবশ্য যাত্রাপথের কিছু অংশ সেই বান্ধবীর সহিত একসাথে আসিয়াছি, সমগ্র দিনের পাওনা বলিতে ওইটুকুই। আমি ভাবিলাম যাহা হইল ভালই হইল, খারাপ অনেক কিছুই ঘটিলে ঘটিতে পারিত; কত যান দূর্ঘটনা তো ঘটে, আমিও তাহার শিকার হইতে পারিতাম কিন্তু হই নাই সেটা তো উপরওয়ালার মর্জির জোরেই। আমি পকেট হইতে মানি ব্যাগ বাহির করিয়া অবাক নয়নে দেখিলাম বৃত্তির টাকা অক্ষত আছে, হারাইয়া যায় নাই; আমার কানের কাছে তখন কে যেন ফিস্ফিস্ করয়িা বলিল,‘ আহ! শেষ ভালো যার সব ভালো তার, মাঝখানে যাই ঘটুক। আমি আকাশের দিকে তাকাইলাম, কিছুক্ষণ আগে অট্টহাস্যে শরীর দোলাইতেছিল যে, তাহাকে আর দেখিতে পাইলাম না; মাথা নামাইয়া ভূমিমুখী করিয়া আমিও মৃদু হাস্য করিলাম কিন্তু তাহাতে শরীর দুলিল না।

এফ এইচ রিগ্যান
২৬.০১.০৯

পৌরুষ         
             (উৎসর্গ-ইভটিজিংএর শিকার সকল বোনদের)


সম্পা খালামনির নাম যে নওরীন আফরোজ, তাহা জানিতে পারিলাম আজই এবং তৎসঙ্গে তাহার উচ্চমাধ্যমিকের যে রেজাল্ট আবিষ্কৃত হইল তাহা আমা অপেক্ষা আড়াইগুন কম এবং জনসন্মুখে প্রকাশ অযোগ্য,সুতরাং আমার নাক আপনা হইতেই সিঁটকাইল।
সম্পা আমার মামীর ছোট বোন এবং প্রায় আমার সমবয়সী।তাহার সহিত বিশেষ একটা যোগাযোগ নাই তাই তাহার সম্পর্কে আমার ভিতরে উচ্চ ধারণাটা না থাকাটাই স্বাভাবিক,কিন্তু ধারণা লাভের সু্যোগ যখন আসিল তখন ভাল করিয়াই ধারনা লাভ করিলাম এবং তাহা সারাজীবন ধরিয়াই মনে থাকিবে।

আমার ক্ষেত্রে ইহা ধ্রুব সত্য যে যদাচ কাহারও দূর্বল দিক লইয়া উপহাস করিয়াছি তো সেই উপহাসই বুমেরাং হইয়া আমাকেই আহত করিয়াছে; সম্পা খালামনির ক্ষেত্রে তাহা আরো যন্ত্রনাদায়ক হইল এবং দুই রাত্রের ঘুম ও সমান দিনের শ্রেণীপাঠ শিক্ষার দফারফা করিয়া তবেই ছাড়িল।
আমি যেইখানে থাকি সেইখানে আমার মামা-মামীও থাকেন।মামী আমাকে পুত্রসম স্নেহ করেন এবং মাঝেমাঝেই তাঁহার সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করিয়া থাকেন। আমি যেদিন খলামনির নাম আবিষ্কার করিলাম তাহার কিছুদিন পর রাতের আহারান্তে মামী আমার সহিত গল্প করিতে বসিলেন। সেইদিন আমার কান যাহা শুনিয়াছে তাহার সবটুকু ভাব যদিও প্রকাশ সম্ভব নহে তবুও যেটুকু মনে আছে তাহার সারমর্ম এই যে-
অনেক চিন্তা-ভাবনা করিয়া অনূজা সম্পাকে তাহারা মহিলা কলেজে ভর্তি করাইয়া দিয়াছিলেন। কিন্ত মহিলা কলেজে ভর্তি হইলেও পুরুষ পশুরা তাহার পিছু ছাড়িল না।
বিজ্ঞান বিভাগে পড়িতেছে ,সুতরাং ছাত্রীর প্রাইভেট পড়া আবশ্যক।কিন্তু অধিক খোঁজাখুজি না করিয়া,বান্ধবীরা যেইখানে পড়িতেছে সেও সেইখানে ভর্তি হইতে স্থীর করিল। শিক্ষক অন্য এক কলেজে অধ্যয়ন করিতেছেন;নওজোয়ান,তাই তাঁহার প্রতি ছাত্রীদের আগ্রহ কিঞ্চিত বেশি।
দীক্ষা আরম্ভ হইল! কিন্তু গতানুগতিক ধারার নহে; সাধারণ পাঠের পাশাপাশি পায়ের উপর পা রাখিয়া খোঁচা মারিয়া ইশারায় কি জানি  গোপন জিনিস শিখাইতে গুরু ব্রতি হইলেন,কিন্তু দূর্বল মেধার ছাত্রী তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারিল না।
গুরু দমিলেন না,এইরূপে বুঝানো যাইতেছে না দেখিয়া তিনি তাঁহার কৌশল পাল্টাইলেন।বিদ্যাভাস শেষে ছাত্রী যখন তাহার খাতা সমর্পন করিল,তখন খাতার পরিবর্তে গুরু ছাত্রীর হাত আটকাইয়া আপন হাতের তালু দিয়া স্থীর করিয়া রাখিলেন।
পায়ের উপযুক্ত ইশারা বুঝিয়াও না বুঝিবার ভান করিয়াছে যে অবাধ্য, হাত হস্তগত করিয়া তাহাকে জব্দ করাটাই প্রকৃত কর্তব্য। ঘটিলও তাহাই,কিন্ত সুখের সময় দীর্ঘক্ষণ থাকিল না। গুরুর গৃহে গৃহিনী আছে,সুতরাং অন্য নারী বিশেষ করিয়া আপন শিষ্যার শরীরের প্রতি যে তাঁহার লোভ আছে এমন কিছু কল্পনা করা অসঙ্গত এবং ক্ষেত্রবিশেষে বড়মাপের অন্যায়ও বটে। এইরূপ অন্যায় করিয়াই ছাত্রী বলপূর্বক আপন হাত টানিয়া লইয়া তাহার শিক্ষককে ভৎসনার সুরে বলিল, ‘ভাইয়া আপনি আমার সাথে এরকম করছেন কেন?’
এতক্ষণ ধরিয়া যাহা বুঝাইতে চাহিলেন ছাত্রী তাহা বুঝিতে পারিয়াছে, কিন্তু গুরুদেব তাহাতে খুশি হইতে পারিলেন না এবং অবলার স্পর্ধা দেখিয়া ভীষন চটিয়া গেলেন,এক্ষণে উচ্ছৃঙ্খলকে শাসাইয়া তিনি বলিলেন “আমি এর শেষ দেখতে চাই” ।
আশেপাশে আর যাহারা বিদ্যার্থীনি ছিল তাহারা নীরবে গুরু-শিষ্যার এই লীলা দেখিতে লাগিল, কেহ টু শব্দটি পর্যন্ত করিল না।
উৎসাহী জওয়ান যে শেষ দেখিতে চাহিয়াছিল,তাহার আরম্ভটা শুরু হইবার পূর্বেই ছাত্রী প্রাইভেটে ইস্তফা দিল।সুতরাং পরিকল্পনা ধুলিস্মাৎ হইয়া গেল এবং গুরুর রাগ এইবার গুরুতর আকার ধারণ করিল।
বিদ্যাশিক্ষা দিয়া যাহার মস্তিষ্ককে দিনের পর দিন উর্বর করিয়াছে,তাহার হাতখানি ধরিয়া স্পর্শ সুখলাভ যে বিশেষ দোষের কিছু নহে তাহা বুদ্ধিমান প্রানীমাত্র কল্পনা করিতে পারে এবং এইজন্য ছাত্রীর এহেন আচরনে গুরুর বন্ধুমহলে চরম অসন্তোষের অবতারণা হইল।
এইদিকে যাহার দূর্মতিতে এইরূপ গোলযোগ উৎপন্ন হইয়াছে তাহার অবস্থাটাও আর খুব স্বাভাবিক থাকিল না। সেইদিন প্রাইভেট শেষে ছাত্রীনিবাসে যখন সে পৌঁছাইল, ঘটনার প্রভাবে তখনও তাহার শরীর কাঁপিতে লাগিল। একসময় সে তাহার বড় বোনের কাছে ফোন করিয়া ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করিল ।কিন্তু “জলে বাস করিয়া কুমিরের সহিত ঝগড়া করা” ছোট ভগ্নিকে বড় বোন তিরষ্কার না করিয়া আপন গৃহে সত্বর উপস্থিত হইতে নির্দেশ করিল।সম্পা নির্দেশ পালনে প্রবৃত্ত হইল কিন্তু তিরিশ কিলোমিটার রাস্তা একা ভ্রমণের সাহস তাহার হইল না।অবশেষে সৌভাগ্যযোগে এক বান্ধবীর সহায়তায় অপরাধী এলাকাছাড়া হইল।
সম্পা স্থান ত্যাগ করিল কিন্তু ভয় তাহাকে ত্যাগ করিল না। দূর্জন হইতে দূরে চলিয়া গিয়া আপনজনের কাছে আসিলেও শত্রুভয়ে তাহার শরীরের কাঁপুনী পূর্বের ন্যায় বহাল থাকিল।
ইহার পরে অনেক দিন অতিবাহিত হইয়াছে,বিস্তীর্ণ পদ্মার অনেক বালুকণা স্থানান্তরিত হইয়াছে,দুই একজন ছাড়া আর সবাই সেই কামুক গুরুর নিকটই বিদ্যাশিক্ষা করিতেছে আর হতভাগীর বিড়ম্বনা কমে নাই বরং পাল্লা দিয়া বাড়িয়াছে। কলেজে গমনকালে এই মোড়ে একবার, ঐ মোড়ে একবার গতিরোধিত হইয়া নানাভাবে হেনস্থা হইতে হইয়াছে। এইদিকে গ্রামের বাড়িতে এক প্রতিবেশীও সম্পার পাণিপ্রার্থী ছিল,ইহাও কম জ্বালাতন করে নাই;ঈশ্বরের কি ইচ্ছা! এই দুই শত্রুতে কাকতালীয়ভাবে সাক্ষাত ঘটিয়া যাহা শুরু হইল তাহা বর্ণনাতীত। কোনদিন এসিড নিক্ষিপ্ত হইবার হুমকি আসিল,কোনদিন বা অপহরণের,আবার একদিন দেখা গেল অচেনা গুন্ডারা আসিয়া সম্পার বাবার গতিরোধ করিয়া টুঁটি চাপিয়া ধরিয়া এই বলিয়া শাসাইয়া গেল যে তাহাদের প্রেরকের সহিত মেয়ের বিবাহ না দিলে জীবনখানা খোঁইয়াইতে হইবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই যে এত কিছু ঘটিয়াছে যাহা তাহার শিক্ষাজীবনের উপর কত বড় প্রভাব ফেলিয়াছে এবং পরিশেষে অন্তরে কত বেদনা ও ক্ষোভ লইয়া এই শিক্ষানগরী হইতে বিতাড়িত হইয়াছে,পুরুষ প্রাণীটি হইয়া আমি তাহার বিন্দুমাত্র কল্পনা করিতে পারিনা; তবে এইটুকু বেশ কল্পনা করিয়ে পারি যে, যাহার নুন্য গ্রেড পয়েন্ট দেখিয়া নাক সিঁটকাইয়াছিলাম তাহারই কৃতিত্ব- যেইখানে আছে হায়েনার হিংস্রতা উপেক্ষা করিয়া কলেজে গমন,পরীক্ষা দিয়া একবারেই পাশ করিবার গৌরব অর্জন এবং আরো অনেক কিছু যাহা আমার মত কুটিল হৃদয়ের পক্ষে প্রকাশ সম্ভবপর নহে।
পত্রিকায় কত ছাত্রির লাঞ্চনার খবর আগ্রহভরে পড়িয়াছি,বন্ধুদের সহিত তাহা লইয়া কত হাসাহাসি করিয়াছি তাহার ইয়ত্তা নাই কিন্তু আজ শুনিলাম আমারই আপনজনের লাঞ্চনার খবর,এই দিবসে আমার দুঃখের সীমা নাই।

যখন আমার বোধদয় হইল তখন মনে হইল অবমানিতার কাছাকাছি হইতে পারিলে তাহার পায়ে হাত রাখিয়া মিনতি করিয়া বলিতাম- মাগো এমন সন্তান জন্ম দিও,যে জগতে আসিয়া পশু এবং পশুর লীলা উপভোগকারী সাক্ষীগোপাল এই আমাদেরকে কচুকাটা করিয়া বিনাশ করিবে।

গল্প শেষ করিয়া মামী আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, “তুমি সে সময় এখানে থাকলে এতো কিছু ঘটত না।“ আমি যদিও জানিতাম পান্ডাটা রাজনীতি করিত এবং হিংস্রের সঙ্গীর অভাব নাই তবুও চরম ক্রোধ সহকারে আমি এই কথা উপস্থাপন করিলাম যে, আমি থাকিলে জ্বালাতন তো দূরের কথা, ভয়ে হারামজাদাটা খালামনির কাছে ঘেঁষিতেই পারিত না,এমনি আমার পৌরুষের জোর!!
কথা শেষ হইতে না হইতেই আমার প্রকৃতির ডাক আসিল এবং আমি দৌড়াইয়া উপযুক্ত স্থানে গমন করিলাম। গেলাম হালকা হইতে কিন্তু হঠাৎ আমি আশ্চর্য হইয়া অনুভব করিলাম আমার মনের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে এবং আরো অনুভব করিলাম যে, যেই আমি বাহুর শক্তি দেখাইয়া বন্ধুদের নিকট বাহবা পাইয়া থাকি, যেই আমার পৌরুষের গৌরবে কখনও কখনও নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটিয়া থাকে সেই আমার পুরুষত্বের মেরুদন্ড ভাঙ্গিয়া গিয়া কখন যেন ইহার রং ম্লান হইয়া গিয়াছে।
উপাসনালয়ে গিয়া কোনদিনও প্রভুর নিকট সুস্বাস্থ্য ব্যাতিত আর কিছু চাহিয়াছি বলিয়া মনে পড়েনা, কিন্তু আজ এই শৌচাগারে বসিয়া বলিলাম- প্রভু আমি যাহা জানি তাহা তোমারও অজানা নহে যে, শুধুমাত্র অধিক সংখ্যকবার বীর্যপাতের মধ্যেই কেবল পৌরুষ নিবন্ধিত থাকেনা বরং অবিচার, উৎপীড়নে বাধা দিবার ক্ষমতাটাই খাঁটি পুরুষত্বের নিয়ামক,আমি তাহাই অর্জন করিতে চাই, হায় ঈশ্বর ! যে অনুপস্থিত বস্তু লইয়া এতকাল পুলকে কাটাইয়াছি,তুমি তাহা সত্বর আমার মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দাও।
ভ্রাম্যমান প্রভু তাহা শুনিয়াছিল কিনা তাহা কে জানে? প্রার্থনা কবুল হইবার জন্য যে নুন্যতম যোগ্যতা লাগে তাহা আমার মত জীবন্মৃত শবদেহে অনুপস্থিত,তবুও আশায় বুক বাঁধি-তিনি তো সর্বদয়াময়!!!                       

দিন গড়াইতেছে আপন বেগে,নূতন নূতন কত কর্মপরিকল্পনাও করিতেছি ঢের, তবুও ইহারই মধ্যে আমার মনের ভেতর এই কথা খোদিত হইয়াছে যে-যেই দিন পুত্রহারা মায়ের চোখের বারিধারা মুছিয়া দিতে পারিব, সম্ভ্রম হারানো মেয়েটির ভাই সাজিয়া প্রতিশোধ লইতে পারিব, হাজারো সম্পাদের উত্যক্তকারীদের অন্তঃত একটাকে সজোরে চপেটাঘাত করিতে পারিব, যেইদিন অন্যায়ভাবে রক্তপাতকারী কোন দূর্ধর্ষ নব্য হালাকু খাঁর গতিরোধ করিতে পারিব কিংবা রক্তমাখা কোন মানবদেহ দেখিয়া আমার চিত্ত প্রকাশ্যে অস্থির হইয়া পড়িবে সেইদিন বুঝিব জগদীশ্বর সর্বত্রই বিরাজমান এবং তিনি শৌচাগারেও উপস্থিত থাকিয়া আমার প্রার্থনা শুনিয়াছেন এবং আমি একটু হইলেও পুরুষত্বপ্রাপ্ত হইয়াছি।

                                         এফ এইচ রিগ্যান
                                          ২৩.০৪.১০

পৌরুষ         
             (উৎসর্গ-ইভটিজিংএর শিকার সকল বোনদের)


সম্পা খালামনির নাম যে নওরীন আফরোজ, তাহা জানিতে পারিলাম আজই এবং তৎসঙ্গে তাহার উচ্চমাধ্যমিকের যে রেজাল্ট আবিষ্কৃত হইল তাহা আমা অপেক্ষা আড়াইগুন কম এবং জনসন্মুখে প্রকাশ অযোগ্য,সুতরাং আমার নাক আপনা হইতেই সিঁটকাইল।
সম্পা আমার মামীর ছোট বোন এবং প্রায় আমার সমবয়সী।তাহার সহিত বিশেষ একটা যোগাযোগ নাই তাই তাহার সম্পর্কে আমার ভিতরে উচ্চ ধারণাটা না থাকাটাই স্বাভাবিক,কিন্তু ধারণা লাভের সু্যোগ যখন আসিল তখন ভাল করিয়াই ধারনা লাভ করিলাম এবং তাহা সারাজীবন ধরিয়াই মনে থাকিবে।

আমার ক্ষেত্রে ইহা ধ্রুব সত্য যে যদাচ কাহারও দূর্বল দিক লইয়া উপহাস করিয়াছি তো সেই উপহাসই বুমেরাং হইয়া আমাকেই আহত করিয়াছে; সম্পা খালামনির ক্ষেত্রে তাহা আরো যন্ত্রনাদায়ক হইল এবং দুই রাত্রের ঘুম ও সমান দিনের শ্রেণীপাঠ শিক্ষার দফারফা করিয়া তবেই ছাড়িল।
আমি যেইখানে থাকি সেইখানে আমার মামা-মামীও থাকেন।মামী আমাকে পুত্রসম স্নেহ করেন এবং মাঝেমাঝেই তাঁহার সুখ-দুঃখের কথা ভাগাভাগি করিয়া থাকেন। আমি যেদিন খলামনির নাম আবিষ্কার করিলাম তাহার কিছুদিন পর রাতের আহারান্তে মামী আমার সহিত গল্প করিতে বসিলেন। সেইদিন আমার কান যাহা শুনিয়াছে তাহার সবটুকু ভাব যদিও প্রকাশ সম্ভব নহে তবুও যেটুকু মনে আছে তাহার সারমর্ম এই যে-
অনেক চিন্তা-ভাবনা করিয়া অনূজা সম্পাকে তাহারা মহিলা কলেজে ভর্তি করাইয়া দিয়াছিলেন। কিন্ত মহিলা কলেজে ভর্তি হইলেও পুরুষ পশুরা তাহার পিছু ছাড়িল না।
বিজ্ঞান বিভাগে পড়িতেছে ,সুতরাং ছাত্রীর প্রাইভেট পড়া আবশ্যক।কিন্তু অধিক খোঁজাখুজি না করিয়া,বান্ধবীরা যেইখানে পড়িতেছে সেও সেইখানে ভর্তি হইতে স্থীর করিল। শিক্ষক অন্য এক কলেজে অধ্যয়ন করিতেছেন;নওজোয়ান,তাই তাঁহার প্রতি ছাত্রীদের আগ্রহ কিঞ্চিত বেশি।
দীক্ষা আরম্ভ হইল! কিন্তু গতানুগতিক ধারার নহে; সাধারণ পাঠের পাশাপাশি পায়ের উপর পা রাখিয়া খোঁচা মারিয়া ইশারায় কি জানি  গোপন জিনিস শিখাইতে গুরু ব্রতি হইলেন,কিন্তু দূর্বল মেধার ছাত্রী তাহা বুঝিয়া উঠিতে পারিল না।
গুরু দমিলেন না,এইরূপে বুঝানো যাইতেছে না দেখিয়া তিনি তাঁহার কৌশল পাল্টাইলেন।বিদ্যাভাস শেষে ছাত্রী যখন তাহার খাতা সমর্পন করিল,তখন খাতার পরিবর্তে গুরু ছাত্রীর হাত আটকাইয়া আপন হাতের তালু দিয়া স্থীর করিয়া রাখিলেন।
পায়ের উপযুক্ত ইশারা বুঝিয়াও না বুঝিবার ভান করিয়াছে যে অবাধ্য, হাত হস্তগত করিয়া তাহাকে জব্দ করাটাই প্রকৃত কর্তব্য। ঘটিলও তাহাই,কিন্ত সুখের সময় দীর্ঘক্ষণ থাকিল না। গুরুর গৃহে গৃহিনী আছে,সুতরাং অন্য নারী বিশেষ করিয়া আপন শিষ্যার শরীরের প্রতি যে তাঁহার লোভ আছে এমন কিছু কল্পনা করা অসঙ্গত এবং ক্ষেত্রবিশেষে বড়মাপের অন্যায়ও বটে। এইরূপ অন্যায় করিয়াই ছাত্রী বলপূর্বক আপন হাত টানিয়া লইয়া তাহার শিক্ষককে ভৎসনার সুরে বলিল, ‘ভাইয়া আপনি আমার সাথে এরকম করছেন কেন?’
এতক্ষণ ধরিয়া যাহা বুঝাইতে চাহিলেন ছাত্রী তাহা বুঝিতে পারিয়াছে, কিন্তু গুরুদেব তাহাতে খুশি হইতে পারিলেন না এবং অবলার স্পর্ধা দেখিয়া ভীষন চটিয়া গেলেন,এক্ষণে উচ্ছৃঙ্খলকে শাসাইয়া তিনি বলিলেন “আমি এর শেষ দেখতে চাই” ।
আশেপাশে আর যাহারা বিদ্যার্থীনি ছিল তাহারা নীরবে গুরু-শিষ্যার এই লীলা দেখিতে লাগিল, কেহ টু শব্দটি পর্যন্ত করিল না।
উৎসাহী জওয়ান যে শেষ দেখিতে চাহিয়াছিল,তাহার আরম্ভটা শুরু হইবার পূর্বেই ছাত্রী প্রাইভেটে ইস্তফা দিল।সুতরাং পরিকল্পনা ধুলিস্মাৎ হইয়া গেল এবং গুরুর রাগ এইবার গুরুতর আকার ধারণ করিল।
বিদ্যাশিক্ষা দিয়া যাহার মস্তিষ্ককে দিনের পর দিন উর্বর করিয়াছে,তাহার হাতখানি ধরিয়া স্পর্শ সুখলাভ যে বিশেষ দোষের কিছু নহে তাহা বুদ্ধিমান প্রানীমাত্র কল্পনা করিতে পারে এবং এইজন্য ছাত্রীর এহেন আচরনে গুরুর বন্ধুমহলে চরম অসন্তোষের অবতারণা হইল।
এইদিকে যাহার দূর্মতিতে এইরূপ গোলযোগ উৎপন্ন হইয়াছে তাহার অবস্থাটাও আর খুব স্বাভাবিক থাকিল না। সেইদিন প্রাইভেট শেষে ছাত্রীনিবাসে যখন সে পৌঁছাইল, ঘটনার প্রভাবে তখনও তাহার শরীর কাঁপিতে লাগিল। একসময় সে তাহার বড় বোনের কাছে ফোন করিয়া ঘটনার আদ্যোপান্ত বর্ণনা করিল ।কিন্তু “জলে বাস করিয়া কুমিরের সহিত ঝগড়া করা” ছোট ভগ্নিকে বড় বোন তিরষ্কার না করিয়া আপন গৃহে সত্বর উপস্থিত হইতে নির্দেশ করিল।সম্পা নির্দেশ পালনে প্রবৃত্ত হইল কিন্তু তিরিশ কিলোমিটার রাস্তা একা ভ্রমণের সাহস তাহার হইল না।অবশেষে সৌভাগ্যযোগে এক বান্ধবীর সহায়তায় অপরাধী এলাকাছাড়া হইল।
সম্পা স্থান ত্যাগ করিল কিন্তু ভয় তাহাকে ত্যাগ করিল না। দূর্জন হইতে দূরে চলিয়া গিয়া আপনজনের কাছে আসিলেও শত্রুভয়ে তাহার শরীরের কাঁপুনী পূর্বের ন্যায় বহাল থাকিল।
ইহার পরে অনেক দিন অতিবাহিত হইয়াছে,বিস্তীর্ণ পদ্মার অনেক বালুকণা স্থানান্তরিত হইয়াছে,দুই একজন ছাড়া আর সবাই সেই কামুক গুরুর নিকটই বিদ্যাশিক্ষা করিতেছে আর হতভাগীর বিড়ম্বনা কমে নাই বরং পাল্লা দিয়া বাড়িয়াছে। কলেজে গমনকালে এই মোড়ে একবার, ঐ মোড়ে একবার গতিরোধিত হইয়া নানাভাবে হেনস্থা হইতে হইয়াছে। এইদিকে গ্রামের বাড়িতে এক প্রতিবেশীও সম্পার পাণিপ্রার্থী ছিল,ইহাও কম জ্বালাতন করে নাই;ঈশ্বরের কি ইচ্ছা! এই দুই শত্রুতে কাকতালীয়ভাবে সাক্ষাত ঘটিয়া যাহা শুরু হইল তাহা বর্ণনাতীত। কোনদিন এসিড নিক্ষিপ্ত হইবার হুমকি আসিল,কোনদিন বা অপহরণের,আবার একদিন দেখা গেল অচেনা গুন্ডারা আসিয়া সম্পার বাবার গতিরোধ করিয়া টুঁটি চাপিয়া ধরিয়া এই বলিয়া শাসাইয়া গেল যে তাহাদের প্রেরকের সহিত মেয়ের বিবাহ না দিলে জীবনখানা খোঁইয়াইতে হইবে ইত্যাদি ইত্যাদি।

এই যে এত কিছু ঘটিয়াছে যাহা তাহার শিক্ষাজীবনের উপর কত বড় প্রভাব ফেলিয়াছে এবং পরিশেষে অন্তরে কত বেদনা ও ক্ষোভ লইয়া এই শিক্ষানগরী হইতে বিতাড়িত হইয়াছে,পুরুষ প্রাণীটি হইয়া আমি তাহার বিন্দুমাত্র কল্পনা করিতে পারিনা; তবে এইটুকু বেশ কল্পনা করিয়ে পারি যে, যাহার নুন্য গ্রেড পয়েন্ট দেখিয়া নাক সিঁটকাইয়াছিলাম তাহারই কৃতিত্ব- যেইখানে আছে হায়েনার হিংস্রতা উপেক্ষা করিয়া কলেজে গমন,পরীক্ষা দিয়া একবারেই পাশ করিবার গৌরব অর্জন এবং আরো অনেক কিছু যাহা আমার মত কুটিল হৃদয়ের পক্ষে প্রকাশ সম্ভবপর নহে।
পত্রিকায় কত ছাত্রির লাঞ্চনার খবর আগ্রহভরে পড়িয়াছি,বন্ধুদের সহিত তাহা লইয়া কত হাসাহাসি করিয়াছি তাহার ইয়ত্তা নাই কিন্তু আজ শুনিলাম আমারই আপনজনের লাঞ্চনার খবর,এই দিবসে আমার দুঃখের সীমা নাই।

যখন আমার বোধদয় হইল তখন মনে হইল অবমানিতার কাছাকাছি হইতে পারিলে তাহার পায়ে হাত রাখিয়া মিনতি করিয়া বলিতাম- মাগো এমন সন্তান জন্ম দিও,যে জগতে আসিয়া পশু এবং পশুর লীলা উপভোগকারী সাক্ষীগোপাল এই আমাদেরকে কচুকাটা করিয়া বিনাশ করিবে।

গল্প শেষ করিয়া মামী আমার দিকে তাকাইয়া বলিল, “তুমি সে সময় এখানে থাকলে এতো কিছু ঘটত না।“ আমি যদিও জানিতাম পান্ডাটা রাজনীতি করিত এবং হিংস্রের সঙ্গীর অভাব নাই তবুও চরম ক্রোধ সহকারে আমি এই কথা উপস্থাপন করিলাম যে, আমি থাকিলে জ্বালাতন তো দূরের কথা, ভয়ে হারামজাদাটা খালামনির কাছে ঘেঁষিতেই পারিত না,এমনি আমার পৌরুষের জোর!!
কথা শেষ হইতে না হইতেই আমার প্রকৃতির ডাক আসিল এবং আমি দৌড়াইয়া উপযুক্ত স্থানে গমন করিলাম। গেলাম হালকা হইতে কিন্তু হঠাৎ আমি আশ্চর্য হইয়া অনুভব করিলাম আমার মনের মধ্যে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হইয়াছে এবং আরো অনুভব করিলাম যে, যেই আমি বাহুর শক্তি দেখাইয়া বন্ধুদের নিকট বাহবা পাইয়া থাকি, যেই আমার পৌরুষের গৌরবে কখনও কখনও নিদ্রায় ব্যাঘাত ঘটিয়া থাকে সেই আমার পুরুষত্বের মেরুদন্ড ভাঙ্গিয়া গিয়া কখন যেন ইহার রং ম্লান হইয়া গিয়াছে।
উপাসনালয়ে গিয়া কোনদিনও প্রভুর নিকট সুস্বাস্থ্য ব্যাতিত আর কিছু চাহিয়াছি বলিয়া মনে পড়েনা, কিন্তু আজ এই শৌচাগারে বসিয়া বলিলাম- প্রভু আমি যাহা জানি তাহা তোমারও অজানা নহে যে, শুধুমাত্র অধিক সংখ্যকবার বীর্যপাতের মধ্যেই কেবল পৌরুষ নিবন্ধিত থাকেনা বরং অবিচার, উৎপীড়নে বাধা দিবার ক্ষমতাটাই খাঁটি পুরুষত্বের নিয়ামক,আমি তাহাই অর্জন করিতে চাই, হায় ঈশ্বর ! যে অনুপস্থিত বস্তু লইয়া এতকাল পুলকে কাটাইয়াছি,তুমি তাহা সত্বর আমার মধ্যে প্রবেশ করাইয়া দাও।
ভ্রাম্যমান প্রভু তাহা শুনিয়াছিল কিনা তাহা কে জানে? প্রার্থনা কবুল হইবার জন্য যে নুন্যতম যোগ্যতা লাগে তাহা আমার মত জীবন্মৃত শবদেহে অনুপস্থিত,তবুও আশায় বুক বাঁধি-তিনি তো সর্বদয়াময়!!!                       

দিন গড়াইতেছে আপন বেগে,নূতন নূতন কত কর্মপরিকল্পনাও করিতেছি ঢের, তবুও ইহারই মধ্যে আমার মনের ভেতর এই কথা খোদিত হইয়াছে যে-যেই দিন পুত্রহারা মায়ের চোখের বারিধারা মুছিয়া দিতে পারিব, সম্ভ্রম হারানো মেয়েটির ভাই সাজিয়া প্রতিশোধ লইতে পারিব, হাজারো সম্পাদের উত্যক্তকারীদের অন্তঃত একটাকে সজোরে চপেটাঘাত করিতে পারিব, যেইদিন অন্যায়ভাবে রক্তপাতকারী কোন দূর্ধর্ষ নব্য হালাকু খাঁর গতিরোধ করিতে পারিব কিংবা রক্তমাখা কোন মানবদেহ দেখিয়া আমার চিত্ত প্রকাশ্যে অস্থির হইয়া পড়িবে সেইদিন বুঝিব জগদীশ্বর সর্বত্রই বিরাজমান এবং তিনি শৌচাগারেও উপস্থিত থাকিয়া আমার প্রার্থনা শুনিয়াছেন এবং আমি একটু হইলেও পুরুষত্বপ্রাপ্ত হইয়াছি।

                                         এফ এইচ রিগ্যান
                                          ২৩.০৪.১০

আজ শনিবার,শনির দশায় যে প্রবল বিশ্বাস ছিল তাহা নহে;তবুও পুর্ববর্তী বিশ্বাসের মাত্রাটা বেশ বাড়িয়া গেল যখন প্রকৌশলের প্রথম ক্লাসে শনিপতির দর্শন মিলিল।পূর্বদিনই পুর্ববর্তী বড় ভাইদের দ্বারা জ্ঞাত হইয়াছি যে, জগতে যে সকল বিরল ও আশ্চর্য ঘটনা রহিয়াছে, পুরকৌশল বিভাগের শিক্ষার্থীদের নিজ হস্ত দ্বারা নিজ কর্ণমর্দন না করার ব্যাপার তাহা অপেক্ষা অধিক আশ্চর্যজনক।
গুজব ছড়াইয়া পড়িতে বিলম্ব হইলনা তবে এও আশ্বস্ত হইলাম যে, যে পন্ডিতের প্রভাবে নিজের হাত আপন কানের উপর অত্যাচারী হইয়া ওঠে ,তিনি তৈলমর্দনকে স্বীয় সহধর্মিণীর ন্যায় পছন্দ করিয়া থাকেন।সুতরাং আগের দিনই খাঁটি তৈল বোতলজাত করিয়া লইয়াছিলাম।
আমি ছিলাম ইংরেজী বর্ণমালার প্রথম অক্ষরের গ্রুপে। অদৃষ্টগুণে দ্বিতীয় বর্ণের গ্রুপে উপস্থিত হইয়া অপমানিত হইবার প্রহর গুনিতেছিলাম। সবার নাম ডাকা হইলেও যখন আমারটা ডাকা হইলনা তখনই বুঝিলাম আমি এই সেকশনের নই।
অপমানিত হইতে হইলনা শুধু নিজ সেকশনে যাইতে নির্দেশ করা হইল।আমি তড়িঘড়ি করিয়া আজ্ঞা পালনে প্রবৃত্ত হইলাম।
সেখানে যিনি ক্লাস লইতেছিলেন তিনি আইনস্টাইন গোছের মানুষ। ভেতরে ঢুকিতেই ন্ম্র সুরে তিনি বলিলেন, ''
দেরি হল কেন ?" আমি ততোধিক নম্র সুরে বলিলাম, 'স্যার, পথ ভুল হয়ে অন্য সেকশনে কিছু সময় নষ্ট হয়েছে।' বাক্যের শেষ শব্দ উচ্চারিত হইবার পূর্বেই তিনি সিংহের ন্যায় গর্জন করিয়া উঠিলেন। আমার মাথা কর্ণবন্ধবী দ্বারা আবদ্ধ ছিল যাহা তাঁহার ভদ্রতা পরিমাপক যন্ত্র দ্বারা অস্বীকৃত হইয়াছিল। আমার মাথা অনুর্বর হইলেও আশু করণীয় কার্য শুরু করিতে বিলম্ব হইলনা। তথাপিও এই কর্ম সম্পাদনে সাহায্য করিতে পন্ডিত মহাশয় নিজে উৎসাহী হইলেন, সজোরে হ্যাঁচকা টান মারিয়া ইহা খুলিয়া কহিলেন 'পোরো ব্যাগে পোরো' । তাহার কিয়ৎ পূর্বেই ইহা ব্যাগে পোরা হইয়াছিল।
কয়েকজন ছাত্রছাত্রী গাদাগাদি করিয়া এক জায়গায় দাঁড়াইয়া রহিয়াছিল। আমাকে তাহা অপেক্ষাও উচ্চাসনে দাঁড়াইতে আদেশ করা হইল যাহাতে আমার চেহারা সকলের দৃষ্টিগোচর হয় । আমাদের সংখ্যা নিত্যান্ত নগণ্য ছিলনা , মনের ভিতর অনবরত উদয় হইতেছিল 'দশে মিলে করি কাজ-হারি জিতি নাহি লাজ ।' কান মলিতে হইলনা,এইরূপ অপরাধ আর সংঘটিত হবে না, এই প্রতিজ্ঞা পু্নঃপু্নঃ করিয়া তবেই মুক্তি পাইলাম ।
এইবার পন্ডিত মহাশয় নিজের বক্তব্য আলোচনা করিতে আরম্ভ করিলেন । আলোচনার আলোচ্য বিষয় এই যে, তিনি নিজে সাংঘাতিক পাংচুয়াল এবং অন্যদের ব্যাপারেও খুব কড়া ।ঘুরাইয়া ফিরাইয়া তিনি বারবার সেই কথাই বুঝাইতে লাগিলেন, আমরাও ভালই বুঝিলাম । এইবার কে কি বুঝিল তাহা উপস্থাপন করিবার পালা ।যাহাদের তৈল মর্দনের কৌশল জানা ছিল তাহারা আপন কার্যগুণে পন্ডিত মহাশয়ের অন্তরের কাছাকাছি বিচরন করিতে লাগিল । কিন্ত আমি? সেই গুনের কিঞ্চিত মালিক হওয়া সত্বেও তাহা হইতে বঞ্চিত হইলাম কারন আমার তৈলের বোতল ক্লাসে ঢুকিবার সঙ্গে সঙ্গেই ভাঙ্গিয়া গিয়াছে ।
Fh Rigan
03.02.08

ভালো