Topic: হৃদরোগ প্রতিরোধে মেডিটেশন

http://www.chobimohol.com/image-5904_4BCDA59A.jpg

বিশ্বে প্রতি বছর দেড় কোটিরও বেশি মানুষ হৃদরোগে মৃত্যুবরণ করে। আর পাশ্চাত্যে মোট মৃত্যুর শতকরা ৪৫ ভাগই ঘটে হৃদরোগে। গবেষণায় দেখা গেছে, আমেরিকায় প্রতি ৫ জনে ১ জনের মৃত্যুর কারণ হৃদরোগ। পাশ্চাত্যের অন্ধ-অনুকরণ আর ভ্রান্ত জীবনাচরণের কারণে বাংলাদেশসহ প্রাচ্যের দেশগুলোতেও এ রোগের প্রকোপ দিন দিন বাড়ছে। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতে, হৃদরোগ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নিলে আগামী ১০ থেকে ১৫ বছরের মধ্যে বাংলাদেশসহ বিভিন্ন উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হৃদরোগ মহামারি আকারে দেখা দেবে।

হৃদরোগের কারণ
এ রোগ একদিনে হুট করে হয় না। দীর্ঘদিন ধরে একটু একটু করে ধমনীতে কোলেস্টেরল জমে মূলত এ রোগের সূত্রপাত ঘটে। উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা, আবেগের আগ্রাসন, কাজের বাড়তি চাপ প্রভৃতি হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ায়। জীবনে ক্রমাগত আশঙ্কা বেড়ে যাওয়া, কাজকর্মে তাড়াহুড়ো, আধুনিক জীবনযাত্রায় নিত্যদিনের দুর্ভাবনা সরাসরি আমাদের শরীরের রক্ত সঞ্চালন প্রক্রিয়া ও হৃিপণ্ডের ওপর প্রভাব ফেলে। হৃদযন্ত্রের নানারকম প্রাণঘাতী অসুখের মধ্যে করোনারি আর্টারি ডিজিজ অন্যতম। এতে হৃিপণ্ডের ধমনীতে কোলেস্টেরল বা চর্বি জমে স্বাভাবিক রক্ত চলাচল ব্যাহত হয়। ফলে হৃিপণ্ডে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায় এবং বুকে ব্যথাসহ নানা উপসর্গ দেখা দেয়। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার গ্রহণ, ধূমপান, মেদস্থূলতা এবং টেনশন বা স্ট্রেস ইত্যাদিকে হৃদরোগের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য কারণ মনে করা হয়।

হৃদরোগের প্রচলিত চিকিত্সা
প্রচলিত চিকিত্সা ব্যবস্থায় ধমনীতে জমে থাকা এ চর্বির স্তর পরিষ্কার করে রক্ত চলাচল স্বাভাবিক করার জন্য ব্লকেজের পরিমাণ অনুসারে ওষুধ, এনজিওপাস্টি কিংবা বাইপাস সার্জারির পরামর্শ দেয়া হয়। কিন্তু এসব করে পুনঃব্লকেজ প্রতিরোধ সম্ভব হয় না। গবেষণায় দেখা গেছে, ব্লকেজের চিকিত্সা করা হলেও ব্লকেজের কারণ ও পুনঃব্লকেজ প্রতিরোধের ব্যাপারে রোগীকে খুব ভালোভাবে সচেতন করা হয় না। ফলে চিকিত্সা গ্রহণের পরও অনেক রোগী আবার নতুন ব্লক নিয়ে চিকিত্সকের শরণাপন্ন হন। যেমন—ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, রক্তের উচ্চ কোলেস্টেরল, হৃদরোগের পারিবারিক ইতিহাস ও ধূমপানের পাশাপাশি হৃদরোগের ক্ষেত্রে অত্যধিক মানসিক চাপ ও দুশ্চিন্তা একটি অন্যতম প্রধান অনুঘটক, যার কোনো চিকিত্সা হৃদরোগের প্রচলিত চিকিত্সা ব্যবস্থায় অনুপস্থিত। অপারেশনের পর রোগী যখন পুরনো জীবন অভ্যাসে ফিরে যায়, সে আবারও আক্রান্ত হয় ব্লকেজসহ হৃদযন্ত্রের নানা জটিলতায়। দেখা গেছে, অপারেশনের পর প্রতি ২০ জনে ১ জন রোগীর আবার হার্ট অ্যাটাক হয় এবং স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় প্রতি ৪০ জনে ১ জন রোগী। আর দ্বিতীয়বার বাইপাস করানো মানে ঝুঁকির পরিমাণ ১০ ভাগ থেকে ২০ ভাগ বেড়ে যাওয়া। অপারেশনের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এবং বিপুল ব্যয়ভারের কথা তো বলাই বাহুল্য।

হৃদরোগ নিরাময় ও প্রতিরোধে মেডিটেশন
নানা গবেষণার মাধ্যমে এটি এখন প্রমাণিত সত্য, মেডিটেশন হৃদরোগের প্রতিরোধ ও নিরাময়— দু’ক্ষেত্রেই খুব কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে। কোলেস্টেরল হার্ট অ্যাটাকের অন্যতম প্রাথমিক কারণ। মেডিটেশন অস্বাভাবিক বেশি কোলেস্টেরল মাত্রাকে কমিয়ে আনতে পারে। ১৯৭৯ সালে দু’জন গবেষক এমজে কুপার এবং এমএম আইজেন ২৩ জন উচ্চ কোলেস্টেরল রোগীর মধ্যে ১২ জনকে মেডিটেশন করান। ১১ মাস পর দেখা যায়, মেডিটেশনকারী গ্রুপের কোলেস্টেরল ২৫৫ থেকে ২২৫-এ নেমে এসেছে। উল্লেখ্য, আমেরিকায় ২২০ মাত্রাকে স্বাভাবিক গড় মাত্রা ধরা হয়। মেডিকেল কলেজ অব জর্জিয়ার ফিজিওলজিস্ট ডা. বার্নেস ১১১ জন তরুণ স্বেচ্ছাসেবীর ওপর এক গবেষণা চালান। এদের মধ্যে ৫৭ জনকে মেডিটেশন করানো হয়, বাকিদের শুধু স্বাস্থ্য সংক্রান্ত তথ্যাদি শেখানো হয়। ৮ মাস পর দেখা যায়, ১ম গ্রুপের সদস্যদের রক্তবাহী নালীর সংকোচন-সম্প্রসারণ ক্ষমতা বেড়েছে ২১ শতাংশ, যা হৃিপণ্ডের সুস্থতার একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কারণ এনডোথিলিয়াম নামের রক্তনালীর আবরণের এ অসুবিধা থেকেই অল্পবয়সে একজন মানুষের শরীরে শুরু হয় হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রক্রিয়া। অন্যদিকে ২য় গ্রুপের এ ক্ষমতা কমেছে ৪ শতাংশ। বয়স বাড়লে হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিও ১ম গ্রুপের ক্ষেত্রে কমেছে। ডা. বার্নেস বলেন, লিপিড কমানোর ওষুধ ব্যবহার করে আগে যে ফল পাওয়া যেত তা-ই পাওয়া যাচ্ছে মেডিটেশনে। ২০০৭ সালে আমেরিকান সাইকসোমাটিক সোসাইটির বার্ষিক কনফারেন্সে এ রিপোর্টটি পেশ করা হয়।

কিছু গবেষণা ও পরিসংখ্যান
মার্কিন হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ডা. ক্রিচটন দীর্ঘ গবেষণার পর দেখিয়েছেন, হৃদরোগের কারণ প্রধানত মানসিক। তিনি বলেছেন, কোলেস্টেরল বা চর্বিজাতীয় পদার্থ জমে করোনারি আর্টারিকে ব্লক করে ফেললেই যে হার্ট অ্যাটাক হবে এমন কোনো কথা নেই। কোরিয়া যুদ্ধের সময় রণক্ষেত্রে নিহত সৈনিকদের অটোপসি করা হতো। ডাক্তাররা সবিস্ময়ে লক্ষ্য করেন, নিহত তরুণ সৈনিকদের শতকরা ৭০ জনেরই আর্টারি চর্বি জমে প্রায় বন্ধ হয়ে এসেছে (অ্যাডভান্সড স্টেজ অব অ্যাথেরোসক্লেরোসিস) এবং হার্ট অ্যাটাকের পথে এগোচ্ছে। এদের মধ্যে ১৯ বছর বয়স্ক তরুণ সৈনিকও ছিল। ডা. ক্রিচটন প্রশ্ন তোলেন, যদি শুধু করোনারি আর্টারিতে চর্বি জমাটাই হৃদরোগের কারণ হতো তাহলে তো এই তরুণ সৈনিকদের মৃত্যু গুলির আঘাতে নয়, হৃদরোগেই হতো। করোনারি আর্টারির ৮৫ শতাংশ বন্ধ অবস্থা নিয়েও একজন ম্যারাথন দৌড়ে অংশ নিয়েছেন; আবার দেখা গেছে, একেবারে পরিষ্কার আর্টারি নিয়ে অপর একজন হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ষাটের দশকে যুক্তরাষ্ট্রে সানফ্রান্সিসকোর ডা. মেয়ার ফ্রেডম্যান এবং ডা. রে রোজেনম্যান দীর্ঘ গবেষণার পর দেখান যে, হৃদরোগের সঙ্গে অস্থিরচিত্ততা, বিদ্বেষ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক দৃষ্টিভঙ্গি বা নেতিবাচক জীবন পদ্ধতির সরাসরি যোগাযোগ রয়েছে। আর রোগ ও অসুস্থতা থেকে মুক্তির জন্য প্রথম প্রয়োজন এই দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদৃষ্টির পরিবর্তন। আর দৃষ্টিভঙ্গি বা জীবনদৃষ্টি পরিবর্তনের সবচেয়ে সহজ পথ হলো মেডিটেশন।

নিজের দায়িত্ব নিতে হবে নিজেকেই

ইংরেজিতে একটি কথা আছে, patient cure themselves, Doctors show the way। নব্য চিকিত্সা ধারার প্রবর্তক ডা. ডিন অরনিশ, ডা. দীপক চোপড়া, ডা. ল্যারি ডসি, ডা. জন রবিন্স, ডা. কার্ল সিমনটন, ডা. বার্নি সিজেল, ডা. ক্রিশ্চিয়ানে নর্থট্রপ, ডা. হার্বার্ট বেনসন, ডা. জোয়ান বরিসেঙ্কো, ডা. এন্ড্রুু ওয়েলস, ডা. এডওয়ার্ড টাওব, ডা. মিখাইল স্যামুয়েলস প্রমুখ ‘বডি, মাইন্ড, স্পিরিট’ সাময়িকীর ১৯৯৭ সালের বিশেষ সংখ্যায় ‘একবিংশ শতকের স্বাস্থ্য’ প্রচ্ছদ কাহিনীতে দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে মত প্রকাশ করেছেন, সুস্থ থাকতে হলে নিজের স্বাস্থ্যের দায়িত্ব নিজেকেই গ্রহণ করতে হবে। নিজেকে নিরাময় করার ক্ষমতা প্রতিটি মানুষের সহজাত ক্ষমতার অন্তর্ভুক্ত। আর এ সহজাত ক্ষমতার সঙ্গে নিজের বিশ্বাসকে সম্পৃক্ত করতে পারলে প্রচলিত চিকিত্সা ব্যবস্থার শতকরা ৯০ ভাগ খরচই অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়বে। কারণ বাইপাস সার্জারি, এনজিওপাস্টি বা সারাজীবন কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রক ওষুধ সেবনের চেয়ে সঠিক জীবনদৃষ্টি গ্রহণ করে জীবনধারা পরিবর্তনের খরচ অনেক কম। ডা. হার্বার্ট বেনসন বলেন, একজন মানুষ নিজেই রিলাক্সেশন বা শিথিলায়ন, মেডিটেশন, ব্যায়াম ও পুষ্টি সংক্রান্ত জ্ঞান লাভ করে তা অনুসরণ এবং নিজের জীবনে প্রয়োগ করতে পারে। বর্তমানে যেখানে রোগীরা ওষুধ বা সার্জারির ওপর নির্ভর করছে, সেখানে তাদের নিজেদের ওপর নির্ভর করতে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। আর সুস্থ জীবনের জন্য নতুন এ চিকিত্সা ধারার অনুসারী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। আপনার স্বাস্থ্য ও নিরাময়ের দায়িত্ব নিতে হবে আপনাকেই। ডাক্তার, ওষুধ, সার্জারি সবই হবে আপনার সহযোগী শক্তি।

সূত্র : এখানে



Re: হৃদরোগ প্রতিরোধে মেডিটেশন

ধন্যবাদ, দারুন তথ্যপূর্ণ টপিক ।

একজন মানুষের জীবন হচ্ছে~ক্ষুদ্র আনন্দের সঞ্চয়,একেকজন মানুষের আনন্দ একেক রকম...http://www.rongmohol.com/uploads/1805_adda_logo_4.gif

গনযোগাযোগ সচিবঃ ফাউন্ডেশন ফর ওপেন সোর্স সলিউশনস বাংলাদেশ, নীতি নির্ধারকঃ মুক্ত প্রযুক্তি।


Re: হৃদরোগ প্রতিরোধে মেডিটেশন

আরো জানতে চাই।