Topic: ব্ল্যাকহোল রহস্য

http://a6.sphotos.ak.fbcdn.net/hphotos-ak-ash4/188336_201812999837748_141426662543049_719291_4848519_n.jpg

ব্ল্যাকহোল বা কৃষäবিবর মহাকাশের এক অনন্য রহস্য। হালকাভাবে বললে বলা যায়, ব্ল্যাকহোল হচ্ছে মহাশূন্যের সেই এলাকা, যেখানে অতিমাত্রায় এর পদার্থ এতটাই ঘনীভূত হয়ে আছে যে, এর আশপাশের বস্তুর কোনো উপায় নেই এর গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ বলের টানকে উপেক্ষা করতে পারে। এই মুহূর্তে আমাদের কাছে সর্বোত্তম গ্র্যাভিটি থিওরি হচ্ছে আইনস্টাইনের জেনারেল থিওরি অব রিলেটিভিটি বা সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব। সে জন্য আমাদের গভীর গবেষণা করতে হবে এই তত্ত্বের ফলাফল নিয়ে ব্ল্যাকহোলের বিস্তারিত জানতে ও বুঝতে হলে। কিন্তু সে কাজটি করতে হবে একটু ধীরে-সুস্খে। গ্র্যাভিটি সম্পর্কে ভাবতে হবে একদম সরল-সহজ ঘটনা নিয়ে।
ধরুন, আপনি দাঁড়িয়ে আছেন কোনো এক গ্রহের ওপরে। খুব একটা জোরে নয় স্বাভাবিক শক্তি খাটিয়ে সোজা ওপরে আকাশের দিকে একটি পাথর ছুড়ে মারুন। পাথরটি কিছু সময় ওপরের দিকে উঠবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত গ্রহটির মধ্যাকর্ষণের টানে তা আবার নিচে নেমে আসবে। যদি পাথরটি পর্যাপ্ত জোরে ছুঁড়তে পারতেন, তবে আপনার দাঁড়িয়ে থাকা গ্রহটির মধ্যাকর্ষণ বলের টান উপেক্ষা করে পাথরটিকে মহাশূন্যে পাঠিয়ে দিতে পারতেন। এটি চিরদিনের জন্য উপরের দিকেই উঠতেই থাকত। এখন কত জোরে অর্থাৎ কত বেগে ছুঁড়লে পাথরটি গ্রহটির টানকে উপেক্ষা করে মহাশূন্যে চলে যেতে পারত, তা নির্ভর করে গ্রহটির ভরের ওপর। যে বেগে ওই পাথরটি ছুড়লে তা মহাকাশে চলে যেতে পারত, তাকে বলা হয় ওই গ্রহের এসকেপ ভেলোসিটি। গ্রহটি যত বেশি বড় বা গুরুভার, এ এসকেপ ভেলোসিটিও তত বেশি। একটি হালকা পাতলা গ্রহের এসকেপ ভেলোসিটি হবে কম। এ ছাড়া আপনি গ্রহটির কেন্দ্র থেকে কত ওপরে অবস্খান করছেন তার ওপর এসকেপ ভেলোসিটির মান নির্ভর করবে। আমাদের পৃথিবীর ক্ষেত্রে এসকেপ ভেলোসিটির মান হচ্ছে সেকেন্ডে ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার বা ঘন্টায় ২৫ হাজার মাইল। চাঁদের বেলায় এর মান সেকেন্ডে মাত্র ২ দশমিক ৪ কিলোমিটার বা ঘন্টায় ৫৩০০ মাইল।
কল্পনা করুন এমন একটি বস্তু, যার ছোট্ট ব্যাসার্ধে প্রচুর পরিমাণ শথঢ়ঢ় বা ভর এমনভাবে ঘনীভূত হয়ে আছে যে, এর এসকেপ ভেলোসিটি আলোর গতির চেয়েও বেশি। যেহেতু কোনো কিছুই আলোর গতির চেয়ে বেশি গতিতে চলতে পারে না, সেহেতু কোনো কিছুই এই বস্তুর গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ বলের ক্ষেত্রের বাইরে যেতে পারবে না। এমনকি আলোকরশ্মিও এ বস্তুর গ্র্যাভিটির টানে ফিরে যাবে ওই বস্তুর দিকেই। অতএব কোনো কিছুই এই বস্তুর আকর্ষণ-বলয় থেকে বেরিয়ে আসতে পারবে না, যেমনটি পারবে না আলোও। আর আলো যদি সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে না পারে, তবে স্বাভাবিকভাবেই আমরা তা দেখতে পাব না।
এই শথঢ়ঢ় ধসষধপষয়ড়থয়মসষ বা ভর ঘনীভূত হওয়া কোনো বস্তু থেকে আলোও বাইরে বেরিয়ে আসতে না দেয়ার ধারণা মানুষ জেনে গেছে সেই আঠারোতম শতকের লাপলাসের সময়েই। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্ব আবিষ্কারের প্রায় পরপরই কার্ল সোয়ার্টজচিল্ড এই তত্ত্বের গাণিতিক সমীকরণের সমাধান প্রমাণ করেন। এই সমীকরণে এ ধরনের বস্তু বর্ণিত হয়। এর আরো পরে অপেনহেইমার, ভোকফ ও সিন্ডারের মতো গবেষকদের কর্মসাধনার সূত্র ধরে ১৯৩০-এর দশকে মানুষ গুরুত্ব দিয়ে ভাবতে শুরু করে যে, এ ধরনের ঘনীভূত ভরের বস্তু এই মহাবিশ্বে থাকতে পারে। হ্যাঁ, এই অপেনহেইমারই পরিচালনা করেছিলেন ম্যানহাটান প্রজেক্ট। এসব গবেষক দেখিয়েছেন, যখন একটি ম্যাসিভ বা অতি গুরুভার তারকার জ্বালানি ফুরিয়ে যায়, তখন এটি এর নিজের মহাকর্ষের টানের বিরুদ্ধে নিজেকে আর ধরে রাখতে পারে না। তখন এটি রূপ নেয় একটি ব্ল্যাকহোলে।
সাধারণ আপেক্ষিক তত্ত্বে বিন্যাস করে দেখানো হয়েছে ধৎড়ংথয়ৎড়প সফ ঢ়হথধপয়মশপ বা স্পেসটাইমের বক্রতাকে। স্পেসটাইম হচ্ছে কালের ও সময়ের যুগ্ম প্রেক্ষাপটে ত্রিমাত্রিক অর্থাৎ দৈর্ঘ্য, প্রস্খ ও বেধ সংবলিত মাপ বা নিরীক্ষা। একটি ম্যাসিভ অবজেক্ট বা গুরুভার বস্তু এলোমেলো করে দেয় স্পেস ও টাইমকে। ফলে সেখানে কোথাও জ্যামিতির স্বাভাবিক নিয়ম চলে না। একটি ব্ল্যাকহোলের কাছে স্পেস ও টাইমের এই ওলট-পালট হয় সবচেয়ে ভয়াবহভাবে। এর ফলে ব্ল্যাকহোলগুলো বিশেষ অবাক করা বৈশিষ্ট্যের অধিকারী হয়। বিশেষ করে ব্ল্যাকহোলের রয়েছে ‘ইভেন্ট হরাইজন’ নামে একটা কিছু। এটি একটি স্পেরিক্যাল সারফেস বা গোলীয় উপরিতল, যা নির্ধারণ করে ব্ল্যাকহোলের সীমানা। আপনি সে হরাইজন অতিক্রম করতে পারেন কিন্তু সেখান থেকে আর ফিরে আসতে পারবেন না। এর সরল অর্থ আপনি কোনোক্রমে একবার সে ইভেন্ট হরাইজন পার হয়ে গেলে, সেখান থেকে ফিরে আসার পথ আপনার জন্য চিরদিনের জন্য বìধ হয়ে যাবে। আপনি সোজা চলে যাবেন ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্রের সিঙ্গুলারিটির কাছে। আপনি এ হরাইজনকে ভাবতে পারেন এমন এক জায়গা যেখানে এসকেপ ভেলোসিটি আলোর গতিবেগের সমান। এ হরাইজনের বাইরে এসকেপ ভেলোসিটির মান আলোর গতিবেগের চেয়ে কম। অতএব আপনার রকেটের পর্যাপ্ত গতি থাকলে সেখান থেকে বেরিয়ে পৃথিবীতে ফিরে আসতে পারবেন না। কিন্তু আপনাকে বহনকারী রকেট যদি ভুল করে কোনোক্রমে এই হরাইজনের ভেতরে চলে যায়। তবে রকেটের গতি যত বেশিই হোক না কেন ব্ল্যাকহোলের বাইরে আসার কোনো উপায় অবশেষ থাকবে না। কারণ আপনার পক্ষে আলোর গতিতে কিংবা তার চেয়েও বেশি গতিতে চলা সম্ভব নয়।
এই ইভেন্ট হরাইজনের রয়েছে বেশ কিছু মজার ও অবাক করা গুণাবলি। ধরুন, একজন পর্যবেক্ষক ব্ল্যাকহোল থেকে অনেক দূরে কোথাও আছেন। তার কাছে এ হরাইজনটি মনে হবে খুবই সুন্দর, স্খির, নিশ্চল এক গোলীয় উপরিতল। কিন্তু যদি সে হরাইজনের আরো কাছে চলে যায়, তখন সে দেখতে পাবে, এটি বেশ বড় গতি নিয়ে ছুটে চলেছে। আসলে এটি বাইরের দিকে ছুটে চলেছে আলোর গতিবেগে। এ থেকেও একটা ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, কেন এ হরাইজন অতিক্রম করে ভেতরের দিকে যাওয়া সহজ কিন্তু এ থেকে বেরিয়ে আসা সহজ তো নয়ই, এমনকি একেবারে অসম্ভব। যেহেতু এ হরাইজন বাইরের দিকে আলোর গতিবেগ নিয়ে ছুটে আসছে, সেহেতু এর বাইরে আসতে হলে আপনাকে ছুটতে হবে আলোর গতিবেগের চেয়ে বেশি গতি নিয়ে। আর আলোর গতির চেয়ে বেশি গতিতে ছোটা আপনার পক্ষে সম্ভব নয়, সে জন্য ব্ল্যাকহোল থেকে বেরিয়েও আসতে পারবেন না।
এসব জেনে নিশ্চয়ই অবাক লাগছে। কিছুটা ভয়ও জাগছে মনে। ভয় নেই। এক বিবেচনায় এ হরাইজন এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। আরেক বিবেচনায় এটি উড়ে চলেছে আলোর গতিবেগ নিয়ে। একবার যদি এই হরাইজনের ভেতরে ঢুকেই যান, স্পেস ও টাইম এতটাই ওলট-পালট হয়ে যাবে যে, র‌্যাডিয়েল ডিসটেন্স ও টাইমের বর্ণনাকর কো-অর্ডিনেট বা স্খানিক মান পরিবর্তন হয়ে যায়। অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে দূরত্ব নির্দেশক কো-অর্ডিনেট ড় হয়ে যায় টাইম য় এর মতো । আর য় হয় ড়-এর মতো। সোজা কথায় টাইমলাইক কো-অর্ডিনেট হয় স্পেসলাইক কো-অর্ডিনেট, আর স্পেসলাইক কো-অর্ডিনেট হয় টাইমলাইক কো-অডিনেট। এর একটি পরিণতি হচ্ছে, আপনি আপনাকে ছোট থেকে ছোটতর ড়-এর মানের দিকে যাওয়া থামাতে পারবেন না। ঠিক সাধারণ অবস্খায় আপনি যেমন আপনাকে ভবিষ্যতের দিকে যাওয়া থেকে ফেরাতে পারছেন না। আপনি শুধু ছুটে চলেছেন বড় থেকে বড়তর সময়ের দিকে। এভাবে ব্ল্যাকহোলের ভেতরে থাকলে এক সময় আপনি গিয়ে পৌঁছবেন সিঙ্গুলারিটিতে, যেখানে ড়-এর মান শূন্য। এ পরিস্খিতি এড়াতে আপনি হয়তো চাইবেন রকেটের গতি বাড়িয়ে দিতে কিন্তু কোনো কাজ হবে না, তা আপনি যে দিকেই যেতে চান না কেন। আপনার এ পরিণতি কোনোভাবেই এড়ানো যাবে না। হরাইজনের ভেতরে ঢুকে পড়েছেন, আর চাইছেন ব্ল্যাকহোলের কেন্দ্র থেকে দূরে থাকতে এ যেন গত রোববারকে এড়িয়ে চলে যাওয়ার প্রয়াসেরই মতো। সবশেষে আরেকটি বিষয় জানিয়ে আজকের লেখার ইতি টানতে চাই। জর্জ আর্চিব্যালাড হুইলার ব্ল্যাকহোল নামটি আবিষ্কার করেন। এর আগে এর অনেক নাম দেয়া হলেও এ নামটি সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয় বলে বিবেচিত হয়। এর আগে ব্ল্যাকহোলের একটা নাম ছিল ‘ফেন্সাজেন স্টার’। কেন এমন নাম দেয়া হয়েছিল? ফুরসত ফেলে তা অন্য এক লেখায় ব্যাখ্যা দেয়ার আশা রইল।

সুত্র এখানে

Shout Me Crunch আমার ব্যক্তিগত টেক ওয়েবসাইট।