Topic: ঈদের দিনে শরীরও খুশি থাকুক - ডা. এ আর এম সাইফুদ্দীন একরাম

রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের
সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ আর এম সাইফুদ্দীন একরাম
http://i1132.photobucket.com/albums/m566/sawontheboss4/DrSaifuddinEkram.png


ঈদের দিনে এবাড়ি ওবাড়ি ঘুরে খাওয়াটা বেশিই হয়ে যায়। খাবারগুলো আবার তেল-ঝাল-মিষ্টিতে সয়লাব থাকে। তাই অনেকের জন্যই স্বস্তির হয় না খুশির এই দিনটা। ঈদের দিনের স্বাস্থ্যকর খাবারের পরামর্শ দিয়েছেন রয়্যাল মেলবোর্ন হাসপাতাল, অস্ট্রেলিয়ার ভিজিটিং ফেলো এবং রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সাবেক বিভাগীয় প্রধান অধ্যাপক ডা. এ আর এম সাইফুদ্দীন একরাম   
সুস্থ শরীর সুন্দর জীবনের প্রধান উপায়। স্বাস্থ্যকর জীবন যাপনের জন্য পুষ্টিকর খাবার, শরীর চর্চা, মনের আনন্দ ইত্যাদি গুরুত্বপূর্ণ। ইসলাম ধর্মে শরীর ও মন ভালো রাখার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডের অভিবাসীদের মধ্যে পরিচালিত এক স্বাস্থ্য সমীক্ষায় দেখা যায়, এশিয়ার জনগণের মধ্যে বিশেষভাবে মুসলিমদের জীবনাচরণ এবং স্বাস্থ্যের অবস্থা সবচেয়ে খারাপ। অন্য জনগোষ্ঠী যেখানে ২৪ শতাংশ ধূমপান করে, সেখানে বাংলাদেশিদের ৪০ শতাংশ ধূমপায়ী। এখানে ডায়াবেটিসের হারও অনেক বেশি। বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানিদের মধ্যে এর প্রকোপ অন্যদের চেয়ে পাঁচ গুণ বেশি এবং ভারতীয়দের মধ্যে তিন গুণ। একজন মানুষের দৈনিক যতটুকু ফল ও সবজি খাওয়া উচিত একজন বাংলাদেশি তার মাত্র ২৮ ভাগ খায়।
মুসলমানরা প্রতিবছর রোজা ও ঈদ পালন করেন। তাঁদের জীবনযাত্রায় এর প্রভাবও অনেক। রমজান মাসে খাদ্যাভ্যাসে বেশ পরিবর্তন আসে। ত্রিশ দিন সংযমের ঈদের দিনে খাবারের অয়োজন হয় অনেক বেশি। এটা শরীরের জন্য আচমকা একটা ব্যাপার। অভ্যাসবশে বা রীতিমাফিক ঈদের দিন তেল-চর্বি ও মিষ্টিসমৃদ্ধ প্রচুর খাবার শরীরে প্রবেশ করে। কিন্তু এটা কতটা স্বাস্থ্যকর?
রোজা পালন শেষে ঈদে স্বাস্থ্যকর খাদ্য গ্রহণ করার ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন জরুরি।

ঈদ এবং স্বাস্থ্যকর খাবার
রোজা রাখলে শরীরের ভেতরে বেশ কিছু পরিবর্তন হয়। বিশেষ করে পুরো মাস যাঁরা রোজা রাখছেন তাঁদের ক্ষেত্রে। সাধারণত শেষ খাবার গ্রহণের আট ঘণ্টা পর শরীরে উপবাসের প্রভাব শুরু হয়। এ সময় অন্ত্র থেকে আর কোনো পুষ্টি উপাদান শোষিত হয় না। অন্য সময় যকৃৎ এবং পেশিতে যে গ্লুকোজ সঞ্চিত থাকে সেটাই শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। কিন্তু রোজা থাকলে শরীরের গ্লুকোজ ফুরিয়ে যাওয়ার পর চর্বি ভেঙে শক্তি তৈরি হয়। পর পর কয়েক দিন অভুক্ত থাকলে শরীর শক্তির জন্য প্রোটিন ব্যবহার করে। তখন শরীর শুকিয়ে যায়। কিন্তু রোজার ফলে এমন অবস্থার সৃষ্টি হয় না। বরং রোজা থাকলে শরীরে চর্বি কমে, কোলেস্টেরল কমে এবং ওজন কমানো সহজ হয়। এর ফলে ডায়াবেটিস এবং উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণ করা সহজ হয়। কয়েক দিন রোজা থাকার পর রক্তে কিছু রাসায়নিক উপাদানের পরিমাণ বেড়ে যায়। এক মাস রোজা রাখার কারণে শরীর এভাবে খাদ্য গ্রহণে অভ্যস্ত হয়ে যায়। সে পাকস্থলীতে গ্রহণ করা খাদ্যদ্রব্য হজমের পর ধীরে ধীরে শক্তি ব্যয় করে। তাই এক মাস রোজা শেষে ঈদের দিন হঠাৎ করে বেশি খাবার বা ভিন্ন ধরনের খাবার এবং দিনের বেলা পানাহারে শরীর অস্বস্তি বোধ করে। কিন্তু উৎসবের আমেজে অনেক সময় বেশি খাওয়া হয়ে যায়; এমন সব খাবার খাওয়া হয়, যার মধ্যে অতিরিক্ত চর্বি, লবণ ইত্যাদি থাকে। শরীর এ ধরনের ভারী খাবার হজম করতে পারে না। তখন শরীর লবণ ও খনিজ পদার্থের ভারসাম্য রক্ষায় হিমশিম খায়।

ঈদের দিনে আনন্দে স্বাস্থ্যকর খাবারের জন্য আমাদের কতগুলো সাধারণ বিষয়ের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
* ঈদের দিন আমরা সেমাই, জর্দা, হালুয়া ইত্যাদি মিষ্টি দ্রব্য খেতে পছন্দ করি। এসব খাবারে চিনি-গুড় এবং দুধ-ঘি যত কম ব্যবহার করা যায় তত ভালো। কারণ চিনি কার্বহাইড্রেট। বাড়তি যা গ্রহণ করা হবে শরীরে চর্বি হিসেবে জমবে। দুধ-ঘি যে প্রক্রিয়ায় খাদ্যদ্রব্যে ব্যবহার করা হয় তা সহজে পাকস্থলী হজম করতে পারে না। তাই গুড়-চিনির পরিবর্তে বিভিন্ন ফলের টুকরো যেমন_খেজুর, কিশমিশ ইত্যাদি ব্যবহার করা যেতে পারে। কলার পিঠা, তালের পিঠা, কাউনের ক্ষীর, চালকুমড়ার হালুয়া, পেঁপের হালুয়া, গাজরের হালুয়া, লাউ দুধ, আনারসের জর্দা, কমলার জর্দা, সাদা দই ইত্যাদি বিকল্পের কথা ভাবা যেতে পারে। এগুলো সহজপাচ্য ও সুস্বাদু।
* ঈদের খাবারের মেন্যুতে সাধারনত গরু কিংবা খাসির মাংসের রেজালা-কোরমা থাকে। গরু-খাসির মাংসে কোলেস্টেরলসহ বেশ কিছু উপাদান থাকে, যা হার্টের রোগীদের জন্য ক্ষতিকর। এগুলোর উচ্চ মানের প্রোটিন কিডনি রোগীদের জন্যও ক্ষতিকর। তা ছাড়া যাদের রক্তনালিতে ব্লক আছে বা ব্লক হওয়ার ঝুঁকি আছে তাদের জন্যও গরু-খাসি এড়িয়ে চলা উচিত। মুরগির মাংসে চর্বি কম থাকে। কাজেই মুরগির মাংসকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে। মুরগির কোরমা, রেজালা, চিকেন টিক্কা, রোস্ট, কালিয়া ইত্যাদি তুলনায় অনেক স্বাস্থ্যকর ও গরুর মাংসের বিকল্প হতে পারে।
* মাংস ছাড়া মাছের রকমারি খাবার পরিবেশন করা যেতে পারে। মাছ সহজে হজম হয়, এতে উপকারী উপাদানের পরিমাণও বেশি। তবে হার্টের রোগী ও অন্যান্য রোগীদের পাঙ্গাশ মাছ (অতিরিক্ত চর্বির কারণে) এড়িয়ে চলা ভালো। মাংসের পরিবর্তে মাছের কোরমা, মাছের দোপেঁয়াজা, চিতল বা ফলি মাছের কোফতা, ইলিশের পেঁয়াজি, ইলিশ কাবাব, আনারস ইলিশ, নারিকেলি ইলিশ, শর্ষে ইলিশ, শর্ষে তেলাপিয়া, রূপচাঁদা দোপেঁয়াজা, রুই মাছের মুড়িঘণ্ট, কৈ মাছের পাতুরি ইত্যাদি পদের ব্যাঞ্জন খুব সুস্বাদু।
* ঈদের খাবারে সবজি থাকা চাই। সবজিতে থাকে প্রচুর আঁশ ও ভিটামিন। এ জন্য থাকতে পারে বিভিন্ন ধরনের তাজা সবজি ও ফলের সালাদ; যেমন_দই দিয়ে শসার সালাদ, টম্যাটো-বাঁধাকপির সালাদ, পাকা ফলের সালাদ ইত্যাদি। এ ছাড়া পরিবেশন করা যেতে পারে সিদ্ধ ঢেঁড়স, বাঁধাকপি কিংবা ফুলকপি, শাকপাতা ভর্তা, পটল কিংবা কাঁকরোলের ভর্তা, পেঁপে ভাজি, মুলা ভাজি, ভাজা ফুলকপি, ভুনা শালগম, ভুনা আলু-বেগুন, লাউ শুক্ত, ঝিঙে ডাল, কপি-আলু-মটরশুঁটির ডালনা ইত্যাদি।
* শাকসবজি রান্নার আগে ধুয়ে কেটে নিতে হয়। খোসা ছাড়ানোর পর বড় টুকরো করে কেটে দেরি না করে রান্না করা ভালো। কাটার পর ধুলে বেশ কিছু ভিটামিন বের হয়ে যায়। অনেকক্ষণ কেটে রাখলেও পুষ্টিমান কমে যায়। হাঁড়ির মুখ বন্ধ করে অল্প পানিতে সিদ্ধ করতে হয়। শাকসবজি অতিরিক্ত তেলে না ভেজে সিদ্ধ করা কিংবা মাইক্রোওয়েভে রান্না করা ভালো। ফলে শাকসবজির ভিটামিন বিনষ্ট হওয়ার ঝুঁকি কমে যায়।
* ঈদের খাবারের তালিকায় তেলে ভাজা খাদ্য যেমন_ শিঙাড়া, সমুচা, পাকোড়া, ডালপুরি ইত্যাদি কম থাকা ভালো। ভাজাপোড়া যেকোনো খাবার হজম হতে দেরি হয় এবং এসিডিটির মতো কিছু অস্বস্তিকর অসুখের কারণ হয়। রান্নার জন্য ঘি কিংবা মাখনের চেয়ে সয়াবিন তেল, সানফ্লাওয়ার অয়েল ইত্যাদি ব্যবহার করা স্বাস্থ্যকর। এখন বাজারে পাওয়া যায় এমন সয়াবিনের বেশির ভাগই কোলেস্টেরলমুক্ত। আর সানফ্লাওয়ার অয়েল কোলেস্টেরলমুক্ত তো বটেই, এতে আছে ওমেগা থ্রি। এ কারণে এই তেল হার্টের জন্য ভালো।
* ঈদের মিষ্টি-তেল ও চর্বিসমৃদ্ধ খাবারের মধ্যে অনেকেই একটু ঝাল-টক খেতে পছন্দ করেন। আর সেটা রুচিপ্রদ এবং পরিপাকের জন্যও সহায়ক। এ জন্য যোগ করা যেতে পারে পুদিনার চাটনি, জলপাইয়ের আচার, আমের চাটনি, আমড়া, তেঁতুল, করমচা কিংবা অন্য কোনো মৌসুমি ফলের আচার।
* যাঁরা খাবারের সঙ্গে পানীয় রাখতে আগ্রহী, তাঁরা কোমল পানীয়ের বদলে বিভিন্ন ধরনের শরবতের কথা চিন্তা করতে পারেন। যেমন_ বেলের শরবত, বাঙ্গি কিংবা তরমুজের শরবত, তেঁতুলের শরবত, লাচ্ছি, বোরহানি, ফালুদা, এলাচ চা, মধু চা ইত্যাদি।
* দীর্ঘ এক মাস রোজার পর ঈদের দিন অতিভোজন না করাই উত্তম। লঘুপাক খাবার অল্প পরিমাণে বারবার খাওয়া শরীরের জন্য সহনীয়।

কালের কন্ঠে লিঙ্ক