Topic: এ বৈষম্যের শেষ কোথায়

[box]
দুই বাচ্চাসহ এক মায়ের আত্মহত্যার করুণ কাহিনী পরে আমরা কেউ বিষ্ময়ে বিমূঢ়, হতবাক হয়েছি, কেউ কেঁদেছি, কেউ মনোবিশ্লেষণে মেতেছি, কেউবা আলোচনা করেছি এ আত্মহত্যা নাকি হত্যা। কিন্তু নির্বিকার থাকা সম্ভব হয়নি কারো পক্ষেই। প্রতিদিনই নানা তর্ক-বিতর্ক হয়েছে, হচ্ছে এখনো। এখন একটি বিষয়ে মানুষ দু’ভাগ হয়ে তর্ক করছেন। একদল বলছেন, আত্মহত্যায় বাধ্য করা হয়েছে। কাজেই আসামীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হওয়া উচিত। অন্যপক্ষ বলছেন, আত্মহত্যাকারীর জন্য কোন সহানুভূতি নয়। এর পাশাপাশি আরেকটি নির্মম ঘটনা হলো এক মা তার দুই সন্তানকে হত্যা করে আত্মহত্যায় ব্যর্থ হয় এবং এক মায়ের কারণে তার সন্তান হত্যার শিকার হয়। এছাড়া নিকট অতীতে বেশ অনেকগুলো কিশোরীর আত্মহত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এরকম ঘটনা আরো হয়তো ঘটছে সমাজের আনাচে-কানাচে যার সব আমরা জানতেও পারছি না। অনেকেই বলেন, নারী শিক্ষিত হলে, অর্থনৈতিকভাবে সাবলম্বী হলে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটবে। এই মা’টিরও যদি তেমন শিক্ষাগত যোগ্যতা থাকতো, তিনি যদি নিজে সাবলম্বী হতেন তাহলে তাকে হয়তো এই পথ বেছে নিতে হতো না। কিন্তু সত্যিই কি তাই? আমি এই মায়ের কথা জানি না কিন্তু অনেক মেয়ের কথা জানি যারা শিক্ষাগত যোগ্যতা ও ইচ্ছা থাকার পরও পারিবারিক বাধার কারণেই চাকরি করতে পারছে না। আমাদের দেশে যে সমস্ত পরিবার অর্থনৈতিকভাবে সচ্ছল তারা মেয়েদের সংসার ও সন্তান পালনের অজুহাতে চাকরি করতে দেয় না। কিন্তু চাকরি তো ছেলের হাতের মোয়া না যে যখন তার প্রয়োজন হবে তখনি একটি চাকরি জুটিয়ে সে ছেলেপেলের দায়িত্বপালন করে ফেলবে। সব দায় যেন মেয়েদেরই। স্বামী থাকলে ঘরে বসে সন্তান লালনপালন করো, না থাকলে চাকরিবাকরি করে লালনপালন করো অথচ হাস্যকরভাবে এও সত্য যে কোন সমস্যা দেখা দিলে বাবা কোনরকম দায়দায়িত্ব পালন না করেও বয়সভেদে আইনের কাছ থেকে বেশ অভিভাবকত্ব পেয়ে যান।

আমাদের দেশে প্রায় দুই দশক ধরে নারী নেতৃত্ব চলছে। রাজনীতি, প্রশাসনসহ সবখানেই আগের তুলনায় নারীর অংশগ্রহণ সন্তোষজনক না হলেও বেড়েছে। কিন্তু নারী নিরাপদ হয়েছে কি? তার প্রতি সহিংসতা অত্যাচার কমেছে কি? বরং তথাকথিত আধুনিক পরিবারে মেয়েদের অসহায়তা অবর্ণনীয়। ঘরের বাইরে প্রগতিশীলতার ভান আর ঘরের ভেতর স্ত্রীর সাথে প্রভুসুলভ আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্যই করা হয় না। আমরা যেন আবার অন্ধকার যুগে ফিরে যাচ্ছি। যেখানে মেয়ে সন্তান অভিশাপ, নারী যেখানে শুধুই সন্তানের জš§দান ও লালন-পালনের জন্য। অপরদিকে অর্থ উপার্জনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীকে পণ্য করে তোলা হয়েছে অথবা করার চেষ্টা করা হয়েছে। নারী হয়েছে দ্বৈত শোষণের শিকার। বাইরে কাজ করার কারণে সংসারের কাজ থেকে সে রেহাই পায়নি। কষ্টার্জিত অর্থ নিজের ইচ্ছে বা প্রয়োজনমতো খরচ করার স্বাধীনতা পায়নি বরং উপার্জনটি স্বামীর বা তার পরিবারের হাতে তুলে দিয়েই সে চাকরি করার অনুমোদন পায়। আবার নিজ যোগ্যতাবলে চাকরি করতে যেয়েও তাদেরকে প্রতিনিয়ত বৈষম্যমূলক আচরণ, যৌন হয়রানি, সহিংসতা ইত্যাদি নানা রকম প্রতিকূলতার মধ্যে টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হয় বা আপোষের কথা ভাবতে হয়। এ যেন ডাঙায় বাঘ তো জলে কুমির। বিচার চাইতে যাওয়াও তার জন্য বিরম্বনা কারণ রাষ্টের প্রতিটি প্রতিষ্ঠান নারীর প্রতি চরমভাবে অসংবেদনশীল। এইসব ঘটনা থেকে একটি বিষয় স্পষ্ট যে আমাদের দেশের নারীরা ভালো নেই, ভালো থাকার কোনো কারণও নেই অবশ্য। হয়তো পরীক্ষা করলে দেখা যাবে নব্বই শতাংশ নারীই মানসিকভাবে অসুস্থ। এর কারণও বহুবিধ। সত্যিকারভাবে, নারীর আসলে সুস্থ থাকার কোন সুযোগই নেই। আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রযন্ত্র নারীর প্রতি চরমভাবে অসংবেদনশীল। তীব্র পুরুষতান্ত্রিক এই সমাজে একটি মেয়ে শিশু অবস্থা থেকেই নানারকম বিধিনিষেধ, অবদমন, ভয়ভীতি, যৌন হয়রানি, যৌন নিপীড়ন, সহিংসতা ইত্যাদির মধ্যে বাস করে এবং পরিবারের মধ্যেও সে হয় বৈষম্যের শিকার। এমনকি পরিবারেও সে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য, বিনোদন সবকিছুতেই বৈষ্যম্যমূলক আচরণ পায়।

বৈষম্যমূলক খাদ্যাভাসের কারণে সে পুষ্টিহীনতায় ভোগে আজীবন। কাজেই সেই দুর্বল অসুস্থ মেয়েটি সুস্থ মানুষ হিসেবে তার দায়দায়িত্ব পালন করতে পারবে তা আশা করা বাতুলতা। কিশোরী থেকে শুরু করে দুই সন্তানের মা পর্যন্ত নারীদের এই আত্মহত্যার মিছিলে সামিল হবার জন্য দিন গুনছে আরো অনেক নারী। তাদেরকে এই অবস্থা থেকে মুক্তি দেয়ার প্রথম ও প্রধান উপায় নারীর প্রতি সমাজের, রাষ্ট্রের বন্ধুসুলভ আচরণ। আইন প্রণয়ন ও এর যথাযথ প্রয়োগ। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে পুরুষতান্ত্রিকতা যার ফলে প্রগতিশীল একটি নারীনীতি এখন পর্যন্ত পাশ করা সম্ভব হয়নি, সিডও সনদের অনেকগুলো ধারায় বাংলাদেশ এখনও সমর্থন দেয়নি। বছরের পর বছর নারীর প্রতি যে অসম্মান, অসহযোগিতা, বৈষম্য করা হয়েছে যুগের ব্যবধানে তা বুমেরাং হয়ে এখন নির্মম প্রত্যাঘাত হানছে সমাজের শরীরে। কিন্তু এই নৃশংসতা, নির্মমতা কারো কাম্য নয় তাই অচিরেই একটি সমতাপূর্ণ সমাজকাঠামো নির্মাণের কথা ভাবতে হবে যেখানে নারী বা পুরুষ নয় মানুষের কথা বলা হবে।[/box]
শাহনাজ নাসরীন
[লেখক: কবি ও গবেষক]

সূত্র: এখানে