Topic: ওষুধগুলো হাতের নাগালে রাখুন

ডা. মিনহাজ উদ্দিন আহমেদ   
ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, ঢাকা।

শহরের বেশিরভাগ মানুষই ঈদের ছুটিতে ছেলে-মেয়ে নিয়ে গ্রামের বাড়ি যান। তাঁদের পরিবেশ এবং জীবনযাপন বদলে যায় হঠাৎ করেই। তাই শিশু-কিশোর তো বটেই; বয়স্করাও রোগব্যাধিতে আক্রান্ত হন।
উৎসব অনুষ্ঠানে এক বাড়িতে অনেক লোকের সমাগম হয়। তাই পানি এবং পয়নিষ্কাশনজনিত দূষণ বেশি হয়। এসময় ডায়রিয়া, ভাইরাল হেপাটাইটিস, টাইফয়েড, সর্দিজ্বর, নিউমোনিয়া, ফুড পয়জনিং বা খাদ্যে বিষক্রিয়া, চিকেন পক্স, চোখ ওঠা, কৃমির সংক্রমণ, চুলকানি, পাঁচড়া ইত্যাদি সংক্রামক ব্যাধি থেকে বাঁচতে বাড়তি সতকর্তা প্রয়োজন।

http://i.imgur.com/4dDzG.jpg

আর জরুরি প্রয়োজনে যেসব ওষুধ ঈদের ছুটিতে হাতের কাছে রাখা উচিত তা হলো_

খাওয়ার স্যালাইন : ডায়রিয়া বা পাতলা পায়খানাজনিত পানিশূন্যতা রোধে খাওয়ার স্যালাইন অপরিহার্য। ডায়রিয়ায় যে পরিমাণ পানি এবং লবণ শরীর থেকে বের হয়ে যায় খাওয়ার স্যালাইন সেই চাহিদা পূরণ করে। ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশু যদি শুধু বুকের দুধ পান করে সে ক্ষেত্রে মায়ের উচিত ঘন ঘন এবং বেশি সময় ধরে বুকের দুধ পান করানো। এ ক্ষেত্রে শিশুর চাহিদা অনুযায়ী বিশুদ্ধ ফুটানো ঠাণ্ডা পানি এবং খাওয়ার স্যালাইন শিশুকে দেওয়া যেতে পারে। ছয় মাসের বেশি বয়সের শিশুর জন্য ভাতের মাড়, চিঁড়ার পানি, ডাবের পানিসহ বিশুদ্ধ পানি এবং স্বাভাবিক খাবার দিতে হবে। তবে সাধারণ হিসেবে ডায়রিয়া আক্রান্ত দুই বছর বয়স পর্যন্ত শিশুরা স্বাভাবিক খাবার তো খাবেই, তারপরও প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর ৫০-১০০ মিলি পরিমাণ অতিরিক্ত তরল খাদ্য খাবে। দুই থেকে ৯ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের ক্ষেত্রে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর অতিরিক্ত ১০০-২০০ মিলি পরিমাণ তরল খাবার দিতে হবে। শিশুর বমি হলে ১০ মিনিট অপেক্ষা করতে হবে এবং ধীরে ধীরে আবার খাওয়ার স্যালাইন শুরু করতে হবে। বড়দের ক্ষেত্রে প্রতিবার পাতলা পায়খানার পর কমপক্ষে আধা লিটার বা চাহিদা অনুযায়ী খাওয়ার স্যালাইন খেতে হবে। লবণ-গুড়ের শরবত ছয় ঘণ্টা এবং প্যাকেটজাত খাওয়ার স্যালাইন একবার তৈরির পর ১২ ঘণ্টা ভালো থাকে।

প্যারাসিটামল (ট্যাবলেট ৫০০ মি.গ্রা বা সিরাপ ১২০ মি.গ্রা প্রতি চামচ) : জ্বর কমানোর জন্য এবং ব্যথা প্রশমনে ব্যবহৃত হয়। উচ্চমাত্রার জ্বর (১০১ ডিগ্রি ফারেনহাইট বা তদূর্ধ্ব) প্রশমনে দুই মাস থেকে তিন বছর বয়সী শিশুদের (চার কেজি থেকে ১৪ কেজির ওজন শ্রেণী) জন্য এক চামচ প্যারাসিটামল সিরাপ দিনে তিন থেকে চারবার সেবন করানো যেতে পারে এবং তিন বছর থেকে পাঁচ বছর বয়সী শিশুদের (১৪ কেজি থেকে ১৯ কেজির ওজন শ্রেণী) জন্য দুই চামচ প্যারাসিটামল সিরাপ দিনে তিন থেকে চারবার সেবন করানো যেতে পারে। শিশুর শরীর, হাত-পা কুসুম গরম পানিতে ভালোভাবে স্পঞ্জিং করলে বা মুছে দিলে বেশি জ্বর কমানো যায়। বয়স্করা প্যারাসিটামল ট্যাবলেট দৈনিক তিন থেকে চারবার সেবন করতে পারেন।

অ্যান্টাসিড : অতিরিক্ত এসিডিটি বা পাকস্থলীর গ্যাসের সমস্যার জন্য প্রাপ্তবয়স্করা দুটি ট্যাবলেট (চুষে খাওয়ার জন্য) অথবা দুই চামচ এন্টাসিড সাসপেনশন দিনে তিনবার খালি পেটে বা খাওয়ার দুই ঘণ্টা পরে খেতে পারেন। এ ছাড়া এ ধরনের সমস্যায় ওমিপ্রাজল (২০ মি.গ্রা) বা রেনিটিডিন (১৫০ মি.গ্রা) খালি পেটে দৈনিক দুবার সেবন করতে পারেন। আর ইসওমিপ্রাজল ২০ মি.গ্রাম ভরা পেটেও খাওয়া যেতে পারে।
বমির ওষুধ : দীর্ঘ যাত্রায় বমির ভাব বা বমি হতে পারে। এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই ডমপেরিডন (১০ মি.গ্রা) ট্যাবলেট প্রাপ্তবয়স্করা খালি পেটে দৈনিক তিনবার খেতে পারেন।

শ্বাসকষ্ট বা অ্যাজমার ওষুধ : আ্যলার্জির কারণে যাদের শ্বাসকষ্টের প্রাদুর্ভাব হয় তারা সালবিউটামল টেবলেট বা ইনহেলার ব্যবহার করতে পারেন।
অ্যান্টিহিস্টামিন বা অ্যালার্জির ওষুধ : অ্যালার্জিজনিত হাঁচি-কাশি, নাক দিয়ে পানি পড়া, চামড়ায় চুলকানি, মৌমাছি বা পোকার কামড় ইত্যাদি কারণে হিসটামিন জাতীয় সিরাপ বা ট্যাবলেট সঙ্গে রাখা যেতে পারে। যেমন এলাট্রল, প্রেটিন, হিস্টাসিন, ফেক্সো, ফেনাডিন ইত্যাদি।
ইসবগুলের ভুসি : কোষ্ঠকাঠিন্যের জন্য ব্যবহৃত হয়। অতিরিক্ত তেল-চর্বি জাতীয় খাবার, পরিবেশ এবং খাদ্যাভ্যাসের ভিন্নতায় কোষ্ঠকাঠিন্য হয়। এ ক্ষেত্রে দুই চামচ ইসবগুলের ভুসি পানিতে গুলে খাওয়ার সঙ্গে গ্রহণ করা খুব উপকার দেয়।

জিঙ্ক ট্যাবলেট : ডায়রিয়া আক্রান্ত ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শিশুদের ক্ষেত্রে অর্ধেক জিঙ্ক ট্যাবলেট (১০ মি.গ্রা), অল্প পরিমাণ বুকের দুধ, পরিষ্কার পানি বা খাওয়ার স্যালাইনের সঙ্গে মিশিয়ে মোট ১০ দিন সেবন করাতে হবে। ছয় মাসের ঊর্ধ্বের ডায়রিয়া আক্রান্ত শিশুদের জন্য দৈনিক একটি জিঙ্ক ট্যাবলেট এক চামচ পানিতে মিশিয়ে ১০ দিন দিতে হবে।

মেট্রোনিডাজল ট্যাবলেট : যাঁদের বদহজমজনিত বা খাদ্যে বিষক্রিয়াজনিত পেট খারাপ হয় তাঁরা ৪০০ মি.গ্রাম ট্যাবলেট দিনে তিনবার খেতে পারেন।

অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম : যেকোনো ধরনের কাটা, পোকাকামড়ের কামড়, পুড়ে যাওয়া ইত্যাদির জন্য স্যাভলন জাতীয় অ্যান্টিসেপটিক ক্রিম সঙ্গে রাখা দরকার।

এছাড়া ডায়াবেটিস রোগীদের ব্যবহৃত ইনসুলিন, হৃদরোগী এবং ব্লাডপ্রেশারের রোগীদের জন্য ব্যবহৃত নিয়মিত ওষুধ পর্যাপ্ত পরিমাণে সঙ্গে নিতে হবে। সর্বোপরি সুস্থ, স্বাভাবিক ও সুন্দর জীবনের জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণ আর্সেনিকমুক্ত বিশুদ্ধ ও নিরাপদ পানি পান করা উচিত। শিশুরা যেন পুকুরের পানি বা অন্য অনিরাপদ উৎস থেকে সংগৃহীত পানি পান না করে, সেদিকে সর্তকদৃষ্টি রাখা।

সুত্র: কালের কণ্ঠ