Topic: নবজাতকের পরিচর্যা - ডা. মো. মজিবুর রহমান মামুন

জন্মের পর একটি শিশু হঠাৎ করেই সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে চলে আসে। মায়ের গর্ভে নীরবে, নিশ্চিন্তে থাকা নবজাতক শিশুর পৃথিবীর আলো-পরিবেশে খাপ খাইয়ে নিতে বড়ই কষ্ট লাগে। খাওয়া-দাওয়া, ঘুম, চারদিকের পরিবেশ সবকিছুই তার কাছে নতুন। তাই নতুন পরিবেশে শিশুর প্রয়োজন বিশেষ যত্ন ও পরিচর্যা।

http://www.dainikdestiny.com/admin/news_images/305/image_305_56902.jpg

সাধারণত মা-ই তার সন্তানের সর্বাধিক যত্ন নিতে পারেন। তারপরও মাসহ নবজাতক শিশুর খালা, ফুফু, নানি, দাদি অনেকেই এ ব্যাপারে সাহায্য করে থাকেন। নবজাতক শিশুর পরিচর্যাকারীকে অবশ্যই কয়েকটি বিষয় লক্ষ্য রাখতে হবে_
মা ছাড়া শিশুর যত্ন অন্য কেউ নিলে তাকে অবশ্যই সংক্রামক রোগমুক্ত হতে হবে।
পরিচর্যাকারীর পোশাক-পরিচ্ছদ সব সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকতে হবে।
শিশুকে খাওয়ানো কিংবা কোলে নেয়ার ক্ষেত্রে হাত সব সময় সাবান, লিকুইডসোপ, হেক্সিসল বা স্পিরিট দিয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে।
নবজাতকের পরিবেশ
নবজাতক শিশুর জন্য প্রয়োজন খোলামেলা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন পরিবেশ। এ ক্ষেত্রে যেসব বিষয়ে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন তা হল_
* নবজাতকের ঘরে যেন পর্যাপ্ত আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে।
* ঘরে আসবাবপত্র কম রাখা উচিত, প্রয়োজনে সাময়িক সময়ের জন্য ঘর থেকে অতিরিক্ত বা মা-শিশুর প্রয়োজন হবে না এমন জিনিস সরিয়ে ফেলতে হবে।
* কোনোভাবেই ঘরে যেন ধুলাবালি কিংবা পোকা-মাকড় থাকতে না পারে সে ব্যাপারে লক্ষ্য রাখতে হবে।
* ঘরের দেয়াল বা মেঝেতে কোনো জাম্প বা স্যাঁতসেঁতে যেন না থাকে।
* নবজাতক শিশুর ঘরে কোনোভাবেই ফুল বা ফুলদানি, ফুলের টব রাখবেন না।
* ঘরের মেঝে, জানালা পরিষ্কার করতে হবে, জীবাণুমুক্ত করতে ডেটল বা স্যাভলন পানি ব্যবহার করা প্রয়োজন।
* ঘরে মশার কয়েল বা স্প্রে করতে হলে শিশুকে অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে তারপর করতে হবে।
* নবজাতকের ঘরে কেউ যেন ধূমপান না করে সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
নবজাতকের বিছানা, পোশাক-পরিচ্ছদ
* নবজাতককে বেশি নরম বিছানায় শোয়ানো ঠিক নয়।
* মা যে ধরনের বিছানায় অভ্যস্ত তাতেই শিশুকে রাখা উচিত।
* শিশুর মাথায় বালিশ না দিয়ে পরিষ্কার কাপড় দিয়ে গোল করে রাখলে মাথার আকৃতি সুন্দর হয়।
* শিশুর চারদিকে কোল-বালিশ বা পাশ বালিশ দেয়া একান্ত দরকার। এতে শিশু মায়ের গর্ভে অল্প পরিসরে থাকার অনুভূতিটা লাভ করতে পারে।
* নবজাতকের পোশাক হওয়া প্রয়োজন পাতলা সূতি কাপড়ের। কেনা জামা-কাপড় না ধুয়ে শিশুকে পরানো যাবে না।
* শিশুর কাঁথা, কাপড়-চোপড় সবই ডেটল বা স্যাভলন দিয়ে ধোয়া একান্ত প্রয়োজন।
নবজাতকের মলমূত্র পরিষ্কার করা
* শিশুর মল-মূত্র পরিষ্কারের ক্ষেত্রে বিশেষ সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে যা করণীয় তা হল_
* মল-মূত্র পরিষ্কার করার জন্য পরিষ্কার সুতি কাপড় ব্যবহার করা উচিত।
* কাপড় বা তুলা পানিতে ভিজিয়ে পায়খানা-প্রস্রাবের জায়গা মুছে নিতে হবে।
* পায়খানা-প্রস্রাব মোছার সময় বেশি চাপাচাপি করবেন না।
* পরিষ্কার করার পর নিজের হাত সাবান দিয়ে ধুয়ে ফেলতে হবে।
* সবশেষে লোশন বা অলিভঅয়েল মেখে দেয়া যেতে পারে। পাউডার মাখবেন না, তাতে শিশুর চামড়ার ভাঁজে পাউডার জমে সংক্রমণ দেখা দিতে পারে।
নবজাতকের গোসল
* জন্মের দুই-তিন দিন পরই সুস্থ নবজাতককে গোসল দেয়া যেতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে কয়েকটি বিষয়ে। যেমন_
* প্রথম দিকে নবজাতককে হালকা গরম পানি দিয়ে মুছে দেয়া যেতে পারে।
* গরমকাল হলে নাভি না পড়া পর্যন্ত এভাবেই গোসল করাতে হবে।
* শীতকাল হলে ১৪ দিন পরও গোসল দিলে কোনো ক্ষতি হবে না।
* নাভি না পড়া পর্যন্ত নাভির জায়গায় পানি লাগানো যাবে না।
* শিশুর গোসলের পানি আগেই ১০-১৫ মিনিট ফুটিয়ে ঠা-া করে নিলে জীবাণু সংক্রমণের কোনো আশঙ্কা থাকে না।
* গোসলের জায়গা গরম থাকা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে দরজা-জানালা বন্ধ করে নিলে ভালো হয়।
* গোসলের সময়ে কানে যেন পানি না যায় সেদিকে লক্ষ্য রাখতে হবে।
* প্রতিদিন সাবান ব্যবহার করা যাবে না। ৩-৪ দিন পরপর লিকুইড সোপ ব্যবহার করা ভালো।
* নবজাতকের গায়ের পানি, নরম কাপড় বা টাওয়াল দিয়ে আস্তে আস্তে মুছতে হবে। তাড়াতাড়ি করে শিশুর নরম ত্বকের ক্ষতি করবেন না।
* হাত-পায়ের ভাঁজগুলোতে পানি যেন লেগে না থাকে সেদিকে লক্ষ্য রাখা প্রয়োজন।
* গোসল শেষে শরীর মোছার পর পাউডার ব্যবহার না করে লোশন ব্যবহার করা উচিত।
নবজাতকের চোখ, নাক ও কানের যত্ন
* গোসলের পর নবজাতকের চোখ, নাক ও কান ভালোভাবে মুছে নেয়া উচতি।
* শিশুদের চোখ খুবই স্পর্শকাতর, তাই চোখ পরিষ্কার করতে পানিতে ভেজানো নরম কাপড় ও তুলা ব্যবহার করা উচিত।
* নাক ও কান পরিষ্কার করতে কটনবাড ব্যবহার করা একদমই ঠিক নয়। এতে বিপদ হতে পারে। স্বাভাবিক নিয়মেই নাক ও কান পরিষ্কার রাখতে হবে।