Topic: ফ্রোজেন শোলডার বা জমাট কাঁধে করণীয়: ডা. সাহিদা সুলতানা সিমু

মাঝবয়সে এসে অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রচণ্ড ব্যথায় কাঁধ নাড়ানো সম্ভব হচ্ছে না। ধীরে ধীরে কাঁধের সব ধরনের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে আসছে এবং কাঁধ অসাড় হয়ে মনে হয় জমে গিয়েছে। এই পরিস্থিতিকে বলে ফ্রোজেন শোলডার বা জমাট কাঁধ। ফ্রোজেন শোলডার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোগ।

http://i.imgur.com/iYaoa.jpg

এতে কাঁধের অস্থি-সন্ধির নড়াচড়া ব্যথাজনিত কারণে উত্তরোত্তর ব্যাহত হয়ে কাঁধ অসাড় হয়ে পড়ে। জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (নিটোর) সহকারী অধ্যাপক ডা. আব্দুল গনি মোল্লা ফ্রোজেন শোলডার আলোচনা কালে রোগটির লক্ষণ ও উপসর্গসহ নানা দিক তুলে ধরেন। রোগটি বেশ পরিচিত হলেও তিনি বলেন, এই রোগের আসল কারণ এখনও অজানা। তবে ধারণা করা হয়, কাঁধের মাংসপেশির পেশিবন্ধের (মাংসপেশির যে প্রান্তর অংশই হাড়ের সঙ্গে যুক্ত থাকে) প্রদাহ, অপারেশনজনিত কারণে বাহুর পেশিবন্ধের প্রদাহ, প্লাস্টার বা অন্যান্য কারণে কাঁধের মাংসপেশির নড়াচড়া দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা, স্নায়ুর ত্রুটি, বারবার আঘাতে সৃষ্ট ক্ষয় ইত্যাদি কারণে ফ্রোজেন শোলডার হতে পারে। ফ্রোজেন শোলডার সাধারণত পঞ্চাশ থেকে ষাট বছর বয়সী মানুষের ক্ষেত্রে দেখা যায়। মহিলাদের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা পুরুষদের তুলনায় বেশি। শুরুটা হয় ধীরে ধীরে। দীর্ঘদিন কাঁধের ব্যবহার না হওয়ায় অথবা যে কোনো একপাশে হাত একটানা ঝুলিয়ে রাখায়, এক সময় দেখা যায় ওই কাঁধে তীব্র ব্যথা হচ্ছে। ব্যথা অনুভূত হয় কাঁধের অস্থি-সন্ধির সম্মুখ ও পার্শ্বীয় অংশে। এই ব্যথা বিস্তৃত হতে পারে ওই পাশের বাহুর সম্মুখভাগে এবং হাতের সম্মুখ ভাগে। অস্বস্তি অসহনীয় হতে পারে রাতে। ঘুমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে। বাহুর অস্থির ওপরিভাগে প্রযুক্ত চাপ তীব্র ব্যথার জন্ম দিতে পারে। আক্রান্ত কাঁধের পরিধি কমতে থাকে। সঙ্গে থাকতে পারে আশপাশের মাংসপেশির সংকোচন। ফলে সময়ের পরিক্রমায় এক সময় কাঁধের সব ধরনের নড়াচড়া বন্ধ হয়ে যায়। নড়াচড়ার অভাবে এক সময় আশপাশের মাংসপেশি শুকিয়ে আক্রান্ত কাঁধের হাড়গুলোকে অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট দেখতে পাওয়া যায়। অবশ্য কোনো কোনো ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন পর ব্যথা কমে গিয়ে কাঁধের কিছুটা নড়াচড়ার ক্ষমতা ফিরে আসতে পারে। এ ছাড়া স্নায়ুর ত্রুটিজনিত কারণে অনেক সময় আক্রান্ত পাশের হাতের আঙুল ফুলে যাওয়া, ত্বক চকচকে হয়ে যাওয়া, ত্বকে ছোট ছোট দাগের সৃষ্টি হওয়া, হাত ঠাণ্ডা হয়ে যাওয়া, বেশি বেশি হাত ঘেমে যাওয়া (অথবা শুষ্কহাত) প্রভৃতি দেখা যায়। ফ্রোজেন শোলডারের চিকিৎসার প্রাথমিক পর্যায়ে কিছু সাধারণ চিকিৎসা, কিছু নির্দেশিত ব্যায়াম প্রয়োজনে বেদনানাশক ওষুধ প্রভৃতি, সঙ্গে একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত কিছু উপদেশ মেনে চলা। সাধারণ ব্যবস্থার মধ্যে রয়েছে পূর্ণ বিশ্রাম, গরম সেঁক, হাত ঝুলিয়ে রাখা প্রভৃতি। এই পদ্ধতি অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পালন করা উচিত। ব্যথা অসহনীয় হলে, কিংবা সঙ্গে বাতজনিত ব্যাধি থাকলে, প্রয়োজনে অস্থি-সন্ধিতে ইনজেকশন নেওয়া যেতে পারে। ব্যায়াম করতে হবে চিকিৎসকের দেখিয়ে দেওয়া পদ্ধতিতে। বেশি টানাহেঁচড়া না করাই ভালো, তাতে কাঁধের কোনো প্রত্যঙ্গ বা তার অংশ ছিঁড়ে যেতে পারে। তবে প্রয়োজনে সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে ম্যানিপুলেশন করা যায়। আর সব প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার সর্বশেষ সমাধান হলো অপারেশন, তবে ভয় নেই। ফ্রোজেন শোলডার বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চিকিৎসকের নির্দেশিত সাধারণ ব্যবস্থার মাধ্যমেই ভালো হয়ে যায়। অপারেশন যদি প্রয়োজন হয়ও, তথাপি এটি জটিল অপারেশন নয়।

ডা. সাহিদা সুলতানা সিমু
রংপুর মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল