Topic: ফুসফুসে দীর্ঘদিনের রোগ - ডা. এ. আর. এম. সাইফুদ্দীন একরাম

শ্বাসনালীর নানা রকম রোগ হয়ে থাকে। এর মধ্যে হাঁপানি ও দীর্ঘমেয়াদি অবরোধাÍক ফুসফুস রোগের COPD সঙ্গে আমরা সবাই কম-বেশি পরিচিত। লক্ষণ-উপসর্গের কথা দেখে-শুনে এ দুটি রোগকে অনেক সময় আলাদা করে চেনা মুশকিল। কিন্তু এ দুটি রোগের গতিপ্রকৃতি এবং পরিণতি এক রকম নয়।
দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ
দীর্ঘমেয়াদি অবরোধাÍক ফুসফুসের রোগের (Chronic Obstructive Pulmonary) মধ্যে রয়েছে, দীর্ঘমেয়াদি শ্বাসনালীর প্রদাহ (Chronic Bronchities) এবং ফুসফুসের অতি প্রসারণী (Pulmonary Emphysema)। এদের প্রধান বৈশিষ্ট্য হল ফুসফুসের বায়ুপথ সরু হয়ে যাওয়া। এর ফলে ফুসফুসে বায়ু পুরোপুরি ঢুকতে পারে না। ফলে ফুসফুসের বায়ু খালি হয় না। আটকে পড়া বায়ুর জন্য ফুসফুস পরিপূর্ণ মনে হয় ও দম ভারী হয়ে আসে এবং শ্বাসকষ্ট দেখা যায়। একবার ফুসফুসে বায়ু সরবরাহকারী নালীসমূহ সংকীর্ণ হয়ে গেলে, তা সহজে আগের অবস্থায় পুরোপুরি ফিরে আসে না। এর কারণ সংশ্লিষ্ট কোষসমূহে দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহজনিত একটি সংবেদনশীল অবস্থা বিরাজ করতে থাকে।
প্রশ্ন হচ্ছে, কী কারণে ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধাক ব্যাধি হয়ে থাকে? সাধারণত এ রোগের পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা পালন করে থাকে ধূমপান, ধোঁয়া, ধুলাবালি এবং ঘনঘন শ্বাসনালীর সংক্রমণ। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ধূমপানের ভূমিকাই প্রধান। দীর্ঘদিন অতিরিক্ত ধূমপান করলে ফুসফুসের শ্বাসনালী ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং ক্রমশ ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধাÍক রোগের লক্ষণ ও উপসর্গসমূহ প্রকাশ পেতে থাকে। প্রাথমিক পর্যায়ে ধূমপান ছেড়ে দিলে অনেকে এ রোগের কালোথাবা থেকে মুক্তি পেলেও পেতে পারেন; কিন্তু পরিণত অবস্থায় ধূমপান ছাড়লে আর স্বাভাবিক অবস্থা ফিরে আসে না।
অনেকে শহরে ধুলাবালিপূর্ণ ও ধোঁয়াযুক্ত পরিবেশে বসবাস করাকেও এ রোগ সৃষ্টির কারণ হিসেবে বিবেচনা করেন। এ ছাড়া রান্নাঘরের ধোঁয়ারও ভূমিকা থাকতে পারে। শ্বাসনালীতে ঘনঘন রোগজীবাণু সংক্রমণজনিত প্রদাহের ফলে এ রোগের তীব্রতা আরও বেড়ে যায়।
দীর্ঘমেয়াদি অবরোধক ফুসফুসের লক্ষণের মধ্যে রয়েছে কাশ ও অতিরিক্ত শ্লেষ্মা তৈরি হওয়া এবং শ্বাসকষ্ট।
সাধারণত এ ধরনের রোগী বছরের তিন মাসের বেশি ক্রমাগত কাশিতে ভুগে থাকে এবং কাশির সঙ্গে প্রচুর শ্লেষ্মা নির্গত হয়। এ অবস্থা পরপর দুই বছর কিংবা তার চেয়ে বেশি চলতে থাকে। এর সঙ্গে শ্বাসকষ্ট হতে থাকে। যাদের ফুসফুস অতিরিক্ত প্রসারিত হয়ে যায় তাদের শ্বাসকষ্টই বেশি হয়।
সময়মতো পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে চিকিৎসা গ্রহণ না করলে এর ফলে নানা রকম জটিলতা সৃষ্টি হয়। শরীরের মধ্যে অক্সিজেন সরবরাহ কম হওয়ার ফলে এদের রক্তে লাল কণিকার পরিমাণ বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদে হৎপিণ্ডের ডান পাশে চাপ বেশি বেড়ে যাওয়ার ফলে হৎপিণ্ডের প্রসারণ এবং বিকলতা সৃষ্টি হয়। এ ছাড়া রক্তে অক্সিজেন কমে যাওয়া এবং কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে যাওয়ার কারণে শ্বাসতন্ত্রের বিকলতা (Respiratory Failure) হতে পারে।
ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধাÍক রোগ অত্যন্ত জটিল ও গুরুতর রোগ এবং একবার পরিণত অবস্থায় পৌঁছে গেলে এ রোগ আর নিরাময় হয় না। এ জন্য শুরু থেকেই এ রোগ প্রতিরোধ করার জন্য আমাদের সচেতন এবং সচেষ্ট থাকতে হবে।
এ রোগ প্রতিরোধের জন্য কতগুলো বিষয়ে বিশেষভাবে খেয়াল রাখতে হবেÑ
* ধূপপান অবশ্যই পরিহার করতে হবে।
* পেশাগত কারণে আমরা যেসব ধোঁয়া-ধুলা বা বালুকণা শ্বাসের সঙ্গে গ্রহণ করি, তার পরিমাণ কমাতে হবে। এ জন্য ঘরের ভেতরের ও বাইরের সব রকমের উত্তেজক ও অ্যালার্জি সৃষ্টিকারী উপাদান পরিহার করতে হবে।
* ঘরের বায়ু-ধোঁয়া, ধুলামুক্ত এবং পরিষ্কার রাখতে হবে। যে কোন রকম তীব্র গন্ধ, ভাপ, রং, কীটনাশক ইত্যাদি থেকে দূরে থাকতে হবে। ঘরের চুলা থেকে উৎপন্ন ধোঁয়া নিষ্কাশনের সুব্যবস্থা রাখতে হবে।
* ঘনঘন শ্বাসনালী জীবাণু সংক্রমণজনিত প্রদাহ যেন হতে না পারে, সে জন্য সতর্ক থাকতে হবে।
চিকিৎসা
যাদের অবরোধাÍক দীর্ঘমেয়াদি ফুসফুসের রোগ হয়েছে তাদের অবশ্যই হাসপাতালে কিংবা চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণ করতে হবে। এ রোগে ফুসফুসের বায়ু চলাচলের পথ প্রসারিত করার জন্য উপশমকারী ওষুধ দেয়া হয়। এসব ওষুধ বায়ুনালীর সংকোচন কমাতে সাহায্য করে। এ ছাড়া জীবাণু সংক্রমণের লক্ষ্য প্রকাশ পেলে উপযুক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করতে হবে।
টিকা গ্রহণের মাধ্যমে ইনফ্লুয়েঞ্জা এবং নিউমোনিয়ার প্রকোপ কমানো যায়। ফুসফুস ও শ্বাসনালীর ব্যায়াম মানসিক চাপ ও উদ্বেগ প্রশমন, উপযুক্ত পুষ্টিসমৃদ্ধ খাবার গ্রহণ করলে এসব রোগী যথেষ্ট উপকার পেতে পারেন।
ফুসফুসের দীর্ঘমেয়াদি অবরোধক রোগ নিরাময় হয় না। অ্যাজমা বা হাঁপানির চেয়েও এ রোগের ভোগান্তি বেশি এবং পরিণতি ভালো নয়।
অতএব শুরু থেকে সচেতনতা সৃষ্টির মাধ্যমে এ রোগ প্রতিরোধ করা উত্তম। আর প্রতিরোধের মূল চাবিকাঠি ধূমপান থেকে বিরত থাকা।

http://my.jetscreenshot.com/2862/m_20110507-as9e-4kb.jpg
লেখক : বিভাগীয় প্রধান, মেডিসিন বিভাগ, রাজশাহী মেডিকেল কলেজ।