Topic: প্রবাসী ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য

অমল চক্রবর্তী

http://www.dailykalerkantho.com/admin/news_images/483/image_483_143794.jpg


কেতকী কুশারী ডাইসন নীরদ চৌধুরীকে তাঁর অক্সসফোর্ডের বাড়িতে দেখতে গেয়েছিলেন। সফেদ ধুতি-পাঞ্জাবি পরিহিত নীরদ বাবু স্কচ হুইস্কি খাচ্ছেন ঠোঁট না ভিজিয়ে, নেপথ্যে রবীন্দ্রনাথের গান ভেসে আসছে; ফাঁকে ফাঁকে বারবার 'দেশ' 'দেশ' বলছেন। নীরদ বাবু যত দেশি ইংরেজি বই লিখেছেন পঞ্চাশোর্ধ্ব বয়সে, তাঁর চেয়ে বেশি লিখেছেন বাংলা ভাষায় অশীতিপর বয়সে। তাঁর মতো অভিবাসী ভারতীয়দের মধ্যেও আপাতদৃষ্টিতে দুটি প্রবল টান দৃশ্যমান। বিদেশ-বিভুঁইয়ে দেশ থেকে অনেক দূরে স্বতন্ত্র এক দেশ তাঁরা নির্মাণ করেন। স্বদেশিদের চেয়েও শুদ্ধতায় দেশের কথা বলেন ও ভাবেন; কিন্তু না স্বদেশি-না বিদেশি, কেউ তাঁদের গুরুত্বের সঙ্গে নেয় না। দুই সংস্কৃতি, দুই জীবনের মাঝখানে, পুরো জীবন কাটিয়ে দেন এই ত্রিশঙ্কু মানুষরা যেন স্বর্গ থেকে বহিষ্কৃত আদম। সাম্প্রতিক ভারতীয় অভিবাসী ইংরেজি সাহিত্য সেই জীবন আর অন্যসব জীবনের কাহিনী আমাদের সামনে অত্যন্ত সততার সঙ্গে মেলে ধরছে।
ভারতীয় অভিবাসী বা 'ডায়াসপোরা' এখন সাতটি মহাদেশের সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। এই অভিবাসীদের অনেকেই অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক বাস্তবতার কারণে স্বদেশ থেকে বহু দূরে। নাইপলের শিকড় যেমন ক্যারিবীয় দ্বীপপুঞ্জের অনেক দূরে কয়েক প্রজন্ম আগের এক ইনডেন্চারড শ্রমিকের মধ্যে তেমনি মনিকা আলীর শিকড় বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত বাবা, যিনি আর্থিক সচ্ছলতার প্রত্যাশায় লন্ডনে স্থায়ী_তাঁর মধ্যে। ভারতীয় উপমহাদেশ থেকে আসার কারণে এঁদের সবার চিন্তাচেতনার মধ্যে কিছু মিল আবিষ্কার করা যায়। নির্বাসনের কালো দাগ তাঁদের হৃদয়ে ও কলমে ক্রমাগত ক্ষরণ ঘটায়। দক্ষিণ এশীয় অভিবাসী ইংরেজি ভাষার লেখকদের লেখায় তাই 'Exile' একটি বড় বিষয়। এডওয়ার্ড সাঈদ যেমন বলেছেন - 'Exile is the unhealable rift forced between a human and a native place, between the self and its true none.' তাই সত্যিকারের 'হোম' সন্ধান করাটাই এই সাহিত্যের মূল বিষয়।
অভিবাসী ভারতীয়দের ইংরেজিচর্চাকে অনেকেই খুব একটা যে ভালো চোখে দেখেন তা কিন্তু বলা যাবে না। মাইকেল মধুসূদন দত্তের প্রথম জীবনে ইংরেজিতে কাব্য সাধনার ব্যর্থ প্রচেষ্টা ও বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের 'Rajmohon's wife'-এর বিস্তৃত অধ্যায় বাঙালি পাঠককে এই নাক সিটকানো ভাব এনে দেয়। বিদেশি ভাষায় সৃজনশীলতা অসম্ভব বলে দৃঢ়মত দৃঢ়তর হয়। কিন্তু উত্তর-ঔপনিবেশিক এই সময়ে ভাষার প্রতিবন্ধকতা দূর করে অনাবাসী ভারতীয়রা (পড়ুন অভিবাসী দক্ষিণ এশীয়রা) যে সাহিত্যসম্পদ সৃষ্টি করে চলেছেন, তা শুধু বিশ্বসাহিত্যের বিশাল প্রাপ্তিই নয়, প্রাক্তন উপনিবেশের হতশ্রী মানুষগুলোর জন্যও বেশ আশা জাগানিয়া বিষয়। প্রাক্তন উপনিবেশের মানুষের এই কথাকে 'পোস্ট-কলোনিয়াল' সংস্কৃতির উন্মেষ ধরা যায়। বিল অ্যাসক্রফট তাঁর 'Empire Write back'-এ যেমন লিখেছেন- 'Post colonial culture is ineritably a hybrid phenomenon involving a dialectical relationship between the grafted European cultural systems and indigenous on to logy...;' এই ক্রমাগত আত্মপ্রকাশের কারণেই উত্তর-ঔপনিবেশিক লেখকরা বৃত্ত ভাঙছেন ক্রমাগত ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক 'হেজিমনি'কে প্রান্তিক Subversion দিয়ে। এঁদের মধ্যে নাইপাল, রূপাদি, বিক্রম শেঠ, অমিতাভ ঘোষদের মতো দিকপাল যেমন আছেন তেমনি আছেন মনিকা আলী, ঝুম্পা লাহিড়ী, ভারতী মুখার্জি বা অরবিন্দ আদিগাওদের মতো তরুণ প্রজন্ম; যাঁরা বই পড়ে নয়, বরং প্রাত্যহিক যাপিত জীবনের অভিজ্ঞতাকে পুঁজি করে অভিবাসী জীবনের নিয়ত নির্দিষ্ট আর্তনাদ ও অবশ্যম্ভাবী সাংস্কৃতিক মিথস্ক্রিয়াকে মূর্ত করে তুলেছেন।
Tempest নাটকে ৫০০ বছর আগেই শেক্সপিয়ার ঔপনিবেশিক 'হেজিমনি'র এই ভাষাগত সূত্রটি দৃশ্যমান করেছিলেন। যখন 'মূর্খ' ও 'দানবীয়' ক্যালিবান ঔপনিবেশিক প্রভু প্রসপারোকে বলে 'You taught me language; and my profit on't/Is, I know now to curse.' 'তুমি আমাকে ভাষা শিখিয়েছ; আর আমার লাভ এই যে আমি তোমাকে বেশ কষে তালি দেওয়াটা রপ্ত করেছি।' সেই ১৮৩৩ সালে ম্যাকলে ব্রিটিশ পার্লামেন্টে স্বপ্ন দেখেছিলেন ইংরেজি শেখাবেন ভারতীয় কালো চামড়ার মানুষগুলো যেন মানসিকভাবে সাদা ইংরেজদের পদানত থাকে_এই উদ্দেশ্যে। এটি সত্য, ইংরেজি শিখে অনেক ভারতীয় কেরানির চেয়ে বেশি আর কিছু হতে পারেনি। ভাষা যদি নিতান্তই গুটিকয়েক শব্দ মুখস্থ ও দরখাস্ত লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকত তাহলে তো কোনো সমস্যা ছিল না। কিন্তু ভাষা তো বৃহৎ অর্থে ক্ষমতায়ন_চিন্তার প্রাদেশিকতা থেকে বৃহৎ জীবনে পেঁৗছানোর অবলম্বন। Frantz Fanon যেমন বলেছেন_'To Speak a language is to take on a world, a culture.'_ইংরেজির মতো অভিবাসী লেখকরা শুধু ইংরেজি নয়, অসংখ্য সংস্কৃতিতে পেঁৗছতে ও একের পর এক গণ্ডি ভাঙতে পারছেন। তাই অবাক হই না যখন দেখি ইংরেজিকে অবলম্বন করেই জাতীয়তাবাদী আন্দোলন ও সাহিত্য আন্দোলন দুটোই শুরু হয়। সেই ১৮৩০ সালে ডিরোজিও কবিতায় স্বদেশ বন্দনা করেছিলেন যে গাঢ় অনুভূতিতে, তার মাধ্যম ছিল 'অভারতীয়' ইংরেজি। তাঁর শানিত উচ্চারণ_'Harp of my country, Let me strike...’ অনুপ্রাণিত করেছিল ইয়ং বেঙ্গলের অনুসারীদের এবং পরবর্তী সময়ে অভিবাসী ভারতীয় ইংরেজি লেখকদের লেখায়ও অন্তর্লীন সেই স্রোত।
ইংরেজিতে কিভাবে ভারতীয়রা চিন্তা করবে আর কিভাবেই বা তা সাহিত্য পদবাচ্য হবে? প্রথম অনাবাসী ভারতীয় শেখ দীন মোহাম্মদ ১৭৯৩-তে লিখেছেন ভ্রমণকাহিনী Travels of Deen Mahomet আর তারপর প্রায় ২১১ বছর পার হয়ে গেছে। এর মধ্যেই এ ভাষায় লিখে দুজন ভারতীয় বা ভারতীয় বংশোদ্ভূত নোবেল প্রাইজ আর প্রায় গোটা সাতেক বুকার প্রাইজ পেয়ে গেছেন। কিন্তু বিতর্ক এখনো চলছে। সেই ১৯৩৮-এ রাজা রাও লিখেছেন_'The telling has not been easy. One has to convey in a language that is not one's own the spirit that is one's own.... It (English) is the language of our intellectual makeup, ... but not of our emotional makeup. কিন্তু ক্যালিবানের সন্তানরা স্মৃতি, কিংবদন্তি, ন্যারেটিভের জাদু আর জাদুবাস্তবতার ন্যারেটিভ দিয়ে যা লিখছেন, তাকে কিভাবে বলি যে এই ইংরেজি 'Not of our emotional makeup'?
কী লিখছেন অনাবাসী ভারতীয়রা? খুব সহজ করে বলতে গেলে তাঁরা লিখছেন বর্তমান সময়কে, গৃহকাতরতাকে ধারণ করে উদ্বাস্তু জীবনের হতাশাকে অতীত আর বর্তমানের দুই সংস্কৃতির সংঘর্ষ ও মিথস্ক্রিয়াকে তথা পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় অসহায় মানবাত্মার ফাঁকা জীবন সব_সব কিছুকে। নাইপলের কথাই ধরা যাক। কত কিছুই তিনি লিখলেন 'এ হাউস ফর মিস্টার বিশ্বাস'-এর পর থেকে। কিন্তু গৃহ অনুসন্ধানের সেই মোটিভ থেকে তিনি আর বের হতে পারেননি।
তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল সুর অবশ্যই বিচ্ছিন্নতাবোধ। যেমনটা প্রফেসর নিয়াজ জামান বলেছেন_'Alienation and displacement are recurrent themes in the writings of V. S. Naipaul’s. তাঁর 'Enigma of Arrival' অথবা ভ্রমণকাহিনী 'An Area of Darkness'-এর বিচ্ছিন্নতাবোধ প্রতিভাত।
রুশদী সব অনাবাসী ভারতীয়র মধ্যে সবচেয়ে বিতর্কিত, প্রসিদ্ধ ও সবচেয়ে প্রতিভাবান। রূপকের ভঙ্গিতে লেখা মিডনাইটস চিলড্রেনে সালিম সানাইয়ের বাণীতে তিনি ডিকনস্ট্রাবট স্বাধীনতা-পরবর্তী ভারতের রাজনীতি, সংস্কৃতি ও জীবনকে '৪৭-এর ১৫ আগস্টে জন্মানো বিশেষ ক্ষমতার অধিকারী প্রতিটি শিশুর মতো সালিম সিনাইয়ের নাটকীয় জীবন জাদুবাস্তবতার বর্ণনায় প্রাণবন্তু। ইন্দিরা গান্ধীর শাসনামলের জরুরি আইনের সঙ্গে সঙ্গে সেই বিশেষ ক্ষমতা লুপ্ত হয়। ব্যক্তির জীবন, রাজনৈতিক জীবন মিলেমিশে একাকার। 'অ্যারাবিয়ান নাইটস'-এর শাহেরজাদীর গল্প বলার প্রকরণ এই উপন্যাসের প্রতিটি পরতে পরতে সালিম একা যেমন ভাবে_'একদা ছিল রাধা-কৃষ্ণ, রাম-সীতা, লাইলী-মজনু এবং রোমিও-জুলিয়েট, স্পেন্সার-ট্রেসি ও ক্যাথরিন হেপবার্ন'। এভাবে আলেকজান্ডার পোপের মতো 'ব্যথেটিক' প্রতিক্রিয়া তাঁর বর্ণনাশৈলীর প্রাণ। Hybridity-কে ধারণ করে জাদুবাস্তবতার চোখে দেখার এই রীতি পরবর্তী রচনাগুলোতে দেখি। তাঁর বাগান নষ্ট হয়। তাঁর বাড়ির নতুন মালিক বিনষ্ট বাগানের ওপর কংক্রিটের নির্মাণসামগ্রী ফেলে রেখে উচ্ছেদ ঘটান। পরিবর্তনের আঁতুড় গন্ধ সর্বত্র ছড়ায়। অমিতাভ ঘোষের স্বাতন্ত্র্য তাঁর জীবনঘনিষ্ঠ, সমাজতাত্তি্বক দৃষ্টিকোণে এবং পোস্ট কলোনিয়াল জীবনকে ব্যাখ্যা করার প্রচেষ্টায়। তাঁর সবচেয়ে মহৎ সৃষ্টি 'The shadow lines' উপন্যাসে তিনি বাংলাদেশের হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক সংঘাতের প্রসঙ্গ এনেছেন। এর পটভূমি তিন শহর_কলকাতা, ঢাকা ও লন্ডন। আর তিনটি প্রজন্ম আলোচিত এই বর্ণনায়_ঠাকুরমা, মায়াদেবীর প্রজন্ম, ত্রিদিব ও মে প্রাইসের প্রজন্ম এবং বিভাগ-পরবর্তী প্রজন্ম; যেখানে বর্ণনাকারী নিজে, ইলা, রবি এবং নিক প্রাইস আছেন। স্মৃতির ভার এসে উপন্যাসের সময় বহুমাত্রিক করে তুলেছে। ঢাকায় জন্মানো, বড় হওয়া ঠাকুরমার মতো দেশভাগের জ্বালা নিয়ে কত পরিবার দুই পারে আছে! এই উপন্যাসে একটি ক্রমবর্ধমান দেয়াল ও রেখার মোটিফ বার বার মূর্ত হয়ে ওঠে। বুড়ো ঠাকুরদার মতো 'Once you start moving you never stops.' তাঁর মতে ইন্ডিয়া, সিন্ধিয়া, এসব সীমারেখা কিছুই না।
১৯৮৮ সালে প্রকাশিত এই উপন্যাসে এবং ১৯৯২ সালে প্রকাশিত In An Antique Land-এ ঘোষ, রাষ্ট্র ও ব্যক্তির সৃষ্ট কাল্পনিক সীমারেখার যৌক্তিকতাকে প্রশ্ন করেছেন। ২০০২-এ প্রকাশিত The Imam and the Indian প্রবন্ধ সংগ্রহে Indian Diaspora নামে প্রবন্ধে ঘোষ লিখেছেন_It is the mirror in which modern India seeks to know itself. অনাবাসী ভারতীয়র লেখার মধ্য দিয়ে যে জীবন ফুটে উঠেছে, তা ভারতীয় ও বিশ্বজনীন। যেখানে অনাবাসী লেখকরা কল্পনা ও জাদুবাস্তবতার হাত প্রসার করেছেন। অনাবাসী লেখিকারা সেখানে বাস্তবতা ও পটভূমিকে পুঙ্খানুপুঙ্খ করে তুলেছেন। যেমন ঝুম্পা লাহিড়ীর ২০০০ সালে পুলিৎজার পাওয়া গল্পগ্রন্থ 'ইন্টারপ্রিটার অব ম্যালডিজ'-এর কথা ধরা যাক। এর তিনটি গল্পের পটভূমি দক্ষিণ এশীয় মেয়েদের মার্কিন সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে খাপ খাইয়ে চলার সংগ্রাম।
লেখিকা নিজে অনাবাসী মা-বাবার সন্তান হয়ে জন্মেছেন লন্ডনে এবং বেড়ে উঠেছেন আমেরিকায় ও বিয়ে করেছেন হিস্পানি আমেরিকান সাংবাদিককে, যদিও বিয়ের অনুষ্ঠান করেছেন কলকাতায় ঘটা করে বাঙালি কেতায়। তাঁর সৃষ্ট চরিত্রগুলোও দুই সমতলে বাস করে_মার্কিন বাস্তবতা ও ভারতীয় ঐতিহ্যে। বিচ্ছিন্নতাবোধ মূর্ত হয়ে উঠেছে চরিত্রগুলোর মধ্যে। যেমন 'ইন্টারপ্রিটার অব ম্যালভিজ' নামের গল্পে যে উড়িয়া গাইড বাঙালি দম্পতিদের গুজরাটি ভ্রমণসঙ্গী হয় সেই মি. কাপাসি অবাক হয় স্ত্রী ও স্বামীর সম্পর্কের শীতলতা দেখে এবং মিসেস দাস স্বীকার করেন তাঁর আত্মধ্বংসী বিচ্ছিন্নতাকে। 'মি. কাপাসি আমার তীব্র ইচ্ছা এসব কিছু_টেলিভিশন, আমার বাচ্চা, সব কিছুকে জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিই। আর 'মিসেস সেন' গল্পের সেনজায়ন তো পরিষ্কার করে তাঁর বিচ্ছিন্নতাকে যখন বলেন_'Here in the place where Mr. Sen has brought me, I cannot sleep so much in silence'. এই গল্পগ্রন্থের প্রতিটি চরিত্র এক ধরনের রোগে ভোগে, যার কারণ এই অভিবাসী জীবন। তাঁর উপন্যাস দ্য নেমসেক-এর অসীমা যেমন বোঝেন_'For being a foreigner, Ashima is beginning to realise is a sort of lifelong pregnancy... a perpetual wait. ... a continuous felling out of sorts.'
ভারতী মুখার্জির উপন্যাস 'জেসমিনে' দেখি এই সাংস্কৃতিক সংঘর্ষ ও তৎপরবর্তী সংমিশ্রণ। এই উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র জেসমিন বেশ কিছু পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যায় তার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী জীবনে। কয়েক বছরের মধ্যে সে জ্যোতি থেকে জেসমিন এবং জেসমিন থেকে জেন রিপল মেয়ারে রূপান্তর হয়। তার এ রূপান্তর তৈরি করে ‘American Mind’এই রূপান্তরকে ভারতী আশাবাদী দৃষ্টিতে দেখেছেন। দুই সংস্কৃতির যুদ্ধে জেসমিন সব সময় ভ্রাম্যমাণ এক শক্ত, সুদৃঢ় আত্মপরিচয় নির্মাণে। উপন্যাস শেষ হয়েছে এই প্রবহমানতার বাস্তবতায় অভিবাসী জীবনে 'I am out of the door and in the potholed and rutted driveway.’
অপেক্ষাকৃত তরুণী মনিকা আলীর লেখায়ও দেখি অভিবাসী জীবনের নানা সংকট, অনিশ্চয়তা ও এক ধরনের থিতু হওয়ার চেষ্টা। ২০০৩ সালে প্রকাশিত তাঁর 'ব্রিকলেন' উপন্যাসে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জীবনকে অতি বিশ্বস্ততার সঙ্গে তুলে ধরেছেন। এই ডিটেইল্ড ন্যারেটিভের ক্ষমতাই তাঁর উপন্যাসকে ম্যান বুকার প্রাইজ এনে দিয়েছে। পূর্ব লন্ডনের বাঙালি অধ্যুষিত অংশে 'নাইন-ইলেভেন'-পরবর্তী জঙ্গিবাদ, জাতিগত রেষারেষি, আধুনিকতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক ইসলামী চরমপন্থা ও বাংলাদেশি প্রবাসীদের দাম্পত্য সম্পর্ক_সব কিছুই তুলে ধরেছেন মনিকা আলী।
১৮ বছর বয়সে বাংলাদেশ থেকে লন্ডন প্রবাসী চানুর সঙ্গে 'অ্যারেঞ্জড' বিবাহের মাধ্যমে অভিবাসী নাজনীন অসুখী দাম্পত্য জীবনে এক সর্বগ্রাসী শূন্যতায় ভুগে হতাশায় ভেঙে পড়ে।
এই সময় পরকীয়া প্রেমের হাত ধরে করিম নামের চরম ইসলামপন্থী যুবক আসে তার জীবনে। এই উপন্যাসের বিভিন্ন পৃষ্ঠায় প্রামাণিক দলিল হিসেবে ফুটে ওঠে ইংরেজ ও এশীয়দের মধ্যে বর্ণগত ধর্মীয় বিভেদ, একদিকে বর্ণবিদ্বেষী শ্বেতাঙ্গরা লিফলেটের ভয় দেখাচ্ছে এশীয়দের বদ মতলব সম্পর্কে। অন্যদিকে বিভিন্ন গোপন সংগঠনে বিভক্ত ধর্মীয় উগ্রপন্থীরা প্রভাবিত করছে। 'লায়ন হার্ট্স' আর 'বেঙ্গল টাইগারস'দের মধ্যে সংঘাত চলছে এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা আরো বেশি করে ধর্মীয় গোঁড়ামির মধ্যেই যেন আত্মপরিচয় খুঁজে পায়।
অভিবাসী ভারতীয় সাহিত্যের এই গাথা নির্মাণ ক্রমপ্রসারণশীল। সম্প্রতি অরবিন্দ আদিগাওর 'দ্য হোয়াইট টাইগার'-এর বুকার পুরস্কার লাভ সেই সম্ভাবনাকেই ইঙ্গিত করে। রুডিয়ার্ড কিপলিং বিংশ শতাব্দীর গোড়ায় লিখেছিলেন 'East is East, West is west,/and ne'er the twin shall meet'.
কিন্তু অভিবাসী-সাহিত্যিকরা এই বিভাজনের সব বাস্তবতাকে মেনে নিয়েও মিথস্ক্রিয়া ও ক্রমশ বিকাশমান মানবিক ভূগোলকেও তুলে ধরছেন। একসময়কার ভারতীয় ইংরেজি লেখক, যেমন আর কে নারায়ণ, মূলকরাজ আনন্দ বা রাজা রাওয়ের চেয়ে ভিন্ন বর্তমান অভিবাসী ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্যে, যেখানে ‘Exiled' হওয়ার বিষাদ যেমন দৃশ্যমান, তেমনি বিশ্বনাগরিক হওয়ার সম্ভাবনার ক্ষীণ স্বপ্নও উঁকি দেয়। ইংরেজদের কাছ থেকে ভারতীয়রা দুটি জিনিস উত্তরাধিকার সূত্রে পেয়েছে_ক্রিকেট ও ইংরেজি। দুটোতেই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করছে ক্যালিবানের বর্তমান প্রজন্ম, যে অভিজ্ঞতা এখানে বর্ণিত, তা নীরদ বাবুর মতো ইংরেজি সাহিত্যের মাধ্যমে অনেকটা কাল্পনিক নয়। ঝুম্পা লাহিড়ী বা মনিকা আলীদের লেখায় যে সত্য ফুটে উঠছে, তা যাপিত জীবনের কালিতে লেখা। কয়েক শতকের ঔপনিবেশিক সত্তাকে নতুন আলোয় দেখছেন এই লেখক-লেখিকারা, প্রভুর ভাষা স্তুতি করার জন্য নয়, নিজের কথা বলার জন্য। কাকের বাসায় কোকিলের ডিম পাড়ার মতো নয় এই অভিবাসী সাহিত্য, আগের চেয়ে অনেক জোরে, অনেক প্রত্যয়ের সঙ্গে, ভঙ্গিতে অনেক বৈচিত্র্য এনে বিশ্বসাহিত্যের ক্যানভাসে নতুন মাত্রা আনছে এই গোষ্ঠী।

মেডিকেল বই এর সমস্ত সংগ্রহ - এখানে দেখুন
Medical Guideline Books


Re: প্রবাসী ভারতীয় ইংরেজি সাহিত্য

অর্ধেক পড়লাম! বাকিটা পরে।