Topic: গরমে তাপজনিত বিপত্তি ও সতর্কতা - ডা. এম শহীদুর রহমান

ডা. এম শহীদুর রহমান
ফিজিক্যাল মেডিসিন ও রিহেবিলিটেশন বিভাগ
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা

http://img143.imageshack.us/img143/6106/resized12sweat.gif

বাংলাদেশের মতো একটি উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়ার দেশে যখন পরিবেশের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস অতিক্রম করে, তখন শরীরের স্বাভাবিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা ব্যাহত হয়। এ রকম তাপমাত্রায় যখন কেউ শারীরিক পরিশ্রম করে তখন শরীরের ভেতর আরও বেশি তাপ সৃষ্টি করে বিপত্তি ঘটায়। আমাদের শরীরে প্রতিদিন যে তাপ তৈরি হয় তা ঘাম, নির্গত শ্বাস, প্রস্রাব ও পায়খানার সঙ্গে বের হয়ে যায়। তবে প্রধানত ঘামের মাধ্যমেই শরীরে প্রতিনিয়ত তৈরি হওয়া তাপগুলো নির্গত হয়ে থাকে। শরীরের তাপ গ্রহণ যখন তাপ অপসারণের ক্ষমতাকে অতিক্রম করে তখন ভেতরের তাপ বাড়তে থাকে। তাপজনিত অসুস্থতা তখনই হয় যখন বাইরের তাপমাত্রা বেশি থাকে অথবা শরীরে ঘাম তৈরি ব্যাহত হয় অথবা অতি আর্দ্রতার জন্য ঘাম শুকাতে পারে না।

এ গরম আবহাওয়ায় বেশিরভাগ লোককে বাইরে বেরোতে হয়, কাজ করতেই হয়। তাই গ্রীষ্মকালে আমাদের দেশে নানারকম তাপজনিত অসুস্থতা লেগেই থাকে। অধিক তাপের কারণে যেসব গুরুতর অসুস্থতা দেখা যায় এবং যার কারণে মৃত্যু পর্যন্ত হতে পারে সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হল হিট ক্র্যাম্প, হিট এক্জশন এবং হিট স্ট্রোক। এর মধ্যে হিট স্ট্রোক সবচেয়ে বেশি পরিচিত শব্দ। অন্যগুলোও কম গুরুত্বপূর্ণ নয়। তাছাড়া অতি গরমে শিশুদের পাতলা পায়খানা, নিউমোনিয়া ইত্যাদি দেখা দিতে পারে।

হিট ক্র্যাম্প
গরম আবহাওয়ায় প্রচুর ব্যায়াম করলে শরীরের তাপমাত্রা খুব না বাড়লেও পায়ের মাংসপেশীগুলোতে চিবানো ও কামড়ানো ধরনের ব্যথা হয়। একে হিট ক্র্যাম্প বলে। ঘামের সঙ্গে শরীর থেকে প্রচুর লবণ বেরিয়ে গেলে এরকমটি হয়ে থাকে। খনি শ্রমিকদেরও এরকম অবস্থা প্রায়ই হয়ে থাকে সীমিত ভেন্টিলেশন ও অপর্যাপ্ত ঘাম শুকানোর জন্য। পর্যাপ্ত পরিমাণ খাবার স্যালাইন খেলে এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেতে পারে।

হিট এক্জশন বা তাপজনিত ক্লান্তি
এটা হয়ে থাকে যখন শরীরের ভেতরের তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস থেকে ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠে থাকে এবং যখন কোন ব্যক্তি গরম আবহাওয়ায় প্রচুর ব্যায়াম করে। বায়ুমণ্ডলের উচ্চ তাপমাত্রার সঙ্গে যখন আর্দ্রতার আধিক্য যোগ হয় অথবা গায়ের কাপড় পাতলা সুতির না হয় তখন শরীর তাপ অপসারণ করতে না পেরে তাপ নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলে। তাপজনিত ক্লান্তি বা এক্জশনের উপসর্গগুলো হচ্ছে শ্বাস-প্রশ্বাসের গতি বেড়ে যাওয়া, ক্লান্তি, অবসন্নতা, মাংসপেশীর দুর্বলতা এবং কখনও কখনও শকে চলে যাওয়া।

চিকিৎসা
রোগীকে গরম জায়গা বা রোদ থেকে সরিয়ে ঠাণ্ডা বা ছায়ায় নিয়ে আসতে হবে। ফ্যান না থাকলে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে হবে। ঠাণ্ডা পানি দিয়ে শরীর স্পঞ্জিং করিয়ে দিতে হবে। ঠাণ্ডা লবণ পানির সরবত বা খাবার স্যালাইন প্রচুর পরিমাণে পান করতে দিতে হবে। রোগীর অবস্থা বেশি খারাপ হলে বা রোগী খেতে না পারলে শিরায় স্যালাইন দিতে হবে। একজন পূর্ণবয়স্ক ব্যক্তির ২৪ ঘণ্টায় ৫ লিটার তরল বা স্যালাইন লাগতে পারে। একই সঙ্গে রোগীর রক্তের ইলেক্ট্রোলাইট অবশ্যই দেখে নিতে হবে।

হিট স্ট্রোক
উষ্ণ আবহাওয়ার জন্য যেসব অসুস্থতা দেখা যায় তার মধ্যে হিট স্ট্রোক সবচেয়ে মরাÍক। শরীরের তাপমাত্রা যখন ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের উপরে ওঠে এবং শরীরের তাপ নিয়ন্ত্রণকেন্দ্র অকেজো হয়ে পড়ে তখন গুরুতর অসুস্থতা দেখা দেয় এবং মৃত্যুর আশংকাও বেড়ে যায়। প্রচণ্ড মাথাব্যথা, বমি বমি ভাব বা বমি শুরু হয়ে ক্রমান্বয়ে স্নায়ুবিক উপসর্গ দেখা যায়। রোগী কনফিউশন থেকে অজ্ঞান হয়ে যেতে পারে। রোগীর চামড়া প্রায়ই গরম থাকে এবং ঘাম কম হয়। রোগী যদি বয়স্ক হয় এবং আগে থেকেই অসুস্থ থাকে এন্টিকলিনার্জিং এবং ডাই ইউরেটিক ওষুধ খেয়ে থাকে অথবা মদ্য পান করে থাকে তাহলে রোগীর আরও অবনতি ঘটে। শক এবং মস্তিষ্কে ইডেমা থেকে শুরু করে নানারকম জটিলতা দেখা যায়।
চিকিৎসার জন্য রোগীকে দ্রুত আইসিইউতে নিয়ে যেতে হবে। আইসপ্যাক দিয়ে শরীর ঠাণ্ডা করতে হবে। শিরায় স্যালাইন দিতে হবে এবং অন্যান্য জটিলতার যথাযথ চিকিৎসা দিতে হবে।

সতর্কতা
১. শরীরে পানির পরিমাণ কমে গেলে প্রথমেই তার লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় না এবং হঠাৎ করেই কেউ গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
২. একজন সুস্থ লোক যদি হঠাৎ করেই হিট স্ট্রোকে আক্রান্ত হয় তাহলে বুঝতে হবে, আগে থেকেই তার শরীরে পানির ঘাটতি ছিল।
৩. প্রাথমিক সুস্থতার পর শরীরে তরল পদার্থের ভারসাম্য ফিরে আসতে কয়েকদিন লেগে যেতে পারে। কাজেই প্রাথমিক সুস্থতার পরপরই যদি আগের গরম আবহাওয়ায় ফিরে কাজ শুরু করে তাহলে সে আবার অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে।
গরমে অসুস্থতা পরিহার করার জন্য করণীয়
১. প্রচণ্ড গরমে বা তাপদাহে বিশেষ করে রোদের মধ্যে শারীরিক পরিশ্রম না করা।
২. যাদের গরমে পরিশ্রম করতেই হয়Ñ প্রশিক্ষণরত বিভিন্ন বাহিনীর সদস্যরা, খেলোয়াড়রা এবং যারা ফিটনেস এক্সারসাইজ করেন এবং দিনমজুর তারা সঙ্গে কয়েক লিটার তৈরি করা ঠাণ্ডা খাবার স্যালাইন রাখবেন এবং কাজের ফাঁকে ফাঁকে খাবেন।
৩. গরমে কাজ করার সময় মাথাব্যথা বা বমি বমি ভাব হলে অপেক্ষাকৃত ঠাণ্ডা স্থানে ফ্যানের বা পাখার বাতাসে বিশ্রাম নিতে হবে। কাজ সাময়িকভাবে বন্ধ রাখতে হবে।
৪. রোদে হাঁটার সময় সাদা ছাতা ব্যবহার করতে হবে।



Re: গরমে তাপজনিত বিপত্তি ও সতর্কতা - ডা. এম শহীদুর রহমান

সামনে Heat Stroke এর সময় আসছে । সতর্ক হতে হবে।

মেডিকেল বই এর সমস্ত সংগ্রহ - এখানে দেখুন
Medical Guideline Books